Sunday, August 30

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ৪ টাকা করেও ত্রাণ পেয়েছে : টিআইবি

0

চলতি বছরের বন্যায় দেশের ২৮ উপজেলার মানুষের ক্ষয়ক্ষতি ১৯৮৮ সালের ক্ষয়ক্ষতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে এর বিপরীতে যে সরকারি সহায়তা মিলেছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। এই ত্রাণ বিতরণেও হয়েছে নানা অনিয়ম। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ৪ টাকা করেও ত্রাণ পেয়েছে।

টিআইবির বন্যাপরবর্তী এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। রোববার টিআইবিতে আয়োজিত ‘বন্যা ২০১৯ মোকাবেলায় প্রস্তুতি এবং ত্রাণ কার্যক্রমে শুদ্ধাচার পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছর বন্যা মোকাবেলা ও প্রস্তুতিতে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি করা হয়েছে। সক্ষমতা থাকলেও প্রশাসনের অবহেলায় পর্যাপ্ত অর্থ ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। রাজনৈতিক বিবেচনায় ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। স্বজনপ্রীতির কারণে দুস্থরা ত্রাণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। গবেষণাটি বন্যাকবলিত ২৮টি জেলার মধ্যে ৫টি জেলায় করা হয়েছে।

এতে বলা হয়, ২০১৯ সালের বন্যায় স্থান ভেদে ৪০ লাখ মানুষ ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত পানিবন্দি ছিল। সরকারি হিসেবে এ বন্যায় সারা দেশ মোট ১০৮ জন মারা গেছেন। যদিও বেসরকারি হিসেবে এ হিসাব ১১৯ জন দেখানো হয়েছে। অথচ বন্যায় ঝুঁকি যথাযথভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। চর ও হাওর অঞ্চলে বন্যার নিয়মিত প্রকোপকে প্রশাসন স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ৩১ শতাংশ খানার ফসলি জমিতে বালু পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব জমিতে বালুর কারণে আগামী ২ থেকে ৩ বছর ভালো ফসল না হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে গবেষণায়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বন্যা পরিস্থিতিতে পর্যাপ্ত মহড়ার আয়োজন, সতর্কতা ও নিরাপত্তামূলক বার্তা প্রচার করা হয়নি। স্থানীয় জনগণের সম্পদ রক্ষায় ইউনিয়ন পর্যায়ে পদক্ষেপে ঘাটতি পাওয়া গেছে। নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়নি। বাঁধ ও বেড়িবাঁধ সংস্কার এবং নদীভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোয় পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব, ত্রাণের চাহিদা নিরূপণ না করা, ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামতে অপর্যাপ্ত বরাদ্দ, আশ্রয়কেন্দ্রে বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন সেবা নিশ্চিতে প্রস্তুতি না থাকা, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং স্যানিটেশন নিশ্চিতে ঘাটতি, বন্যাকালীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে প্রস্তুতি গ্রহণে ঘাটতি, ত্রাণের অর্থে মন্ত্রীর পরির্দশন করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংস্কার, শিক্ষাসামগ্রী সংরক্ষণ ও পুনর্নির্মাণের পদেক্ষেপে ঘাটতি, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ রক্ষা, ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম-দুর্নীতি, অপর্যাপ্ত ত্রাণ বরাদ্দের ঘাটতি ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এসব কারণে বন্যায় নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীর মৃত্যু হয়েছে। পুনঃস্থাপন করতে সক্ষম না হওয়ায় বিপুল পরিমাণে গবাদিপশুর মৃত্যু হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে টিআইবির পক্ষ থেকে ১৮টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। তার মধ্যেÑ বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, গবাদিপ্রাণী ও সম্পদ রক্ষায় কমিউনিটিভিত্তিক সুরক্ষা কেন্দ্র তৈরি ও সম্পদ সুরক্ষার কৌশল হাতে কলমে শেখানো, বন্যায় ২৪ ঘণ্টা সর্তকবার্তা প্রচার, নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের প্রাধান্য দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিতকরণ, বর্ষা মৌসুমের আগেই বাঁধ বা বেড়িবাঁধ ও যোগাযোগ অবকাঠামো সংস্কার করাসহ ১৮টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় নানা ধরনের উদ্যোগ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও তার গভীরে গেলে নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি উঠে আসছে।

তিনি বলেন, প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সমন্বয় না থাকা ও তাদের অবহেলায় বন্যা প্রস্তুতি ও তা মোকাবেলায় ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়েছে। রাজনৈতিভাবে ত্রাণ বিতরণ ও তালিকা তৈরি করা হয়েছে। স্বজনপ্রীতি করে কাউকে একাধিকবার ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে, আবার কেউ একবারও ত্রাণ পায়নি। ত্রাণের অর্থে মন্ত্রীসহ তার লোকজন বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন। অথচ অনেককে ত্রাণ না পেয়ে না খেয়ে দিন পার করতে হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, গবেষক জাকির হোসেন খান ও এএম জুয়েলসহ আরও অনেকে।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.