Monday, July 27

ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কমেছে: ড.দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

0

অর্থনৈতিক উচ্ছ্বাসের নিচে কালো ছায়া আছে বলে মন্তব্য করেছেন এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফরমের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। কোভিড পরিস্থিতি এবং বিদায়ি অর্থবছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে।

মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে মাত্র ২১ দশমিক ২৫ শতাংশ বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ছোট ও মাঝারি শিল্প খাত ভালো নেই। আয় ও মজুরি কমায় মানুষের ভোগ কমেছে। খাদ্যব্যয় কমিয়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ। ফলে পিছিয়ে পড়াদের সঙ্গে আরও মানুষ যুক্ত হওয়ার চাপ বাড়ছে। এছাড়া রেমিট্যান্সের ঊর্ধ্বগতিতে এক ধরনের ভাঙন ধরেছে।

রোববার ‘জাতীয় বাজেট ২০২১-২১ বাস্তবায়ন : পিছিয়ে পড়া মানুষেরা কীভাবে সুফল পাবে’ শীর্ষক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এসব কথা বলেন। এ মুহূর্তে অর্থনীতির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথা উল্লেখ করেন তিনি। এগুলো হলো-গণটিকা কর্মসূচি, প্রণোদনা প্যাকেজ ও মূল্যস্ফীতি।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘রেমিট্যান্সের জাদু শেষ হতে চলেছে। বিদেশে মানুষ কম গেছে, রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে। জুলাইয়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮ শতাংশ রেমিট্যান্স কমেছে। এটা কি একটি পূর্বাভাস? কারণ, কর্মসংস্থান ও ভোগের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’ দেবপ্রিয় আরও বলেন, বাজেটে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য আর্থিক ও খাদ্য সহায়তায় বরাদ্দ কম। এই বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

এছাড়া তাদের গণটিকা কর্মসূচির আওতায় আনতে বেসরকারি সংস্থাকে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি। এ সময় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রশংসা করেন ড. দেবপ্রিয়।

তিনি বলেন, জিডিপির প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এখন পরিসংখ্যান ব্যুরো যে তথ্য দিয়েছে, তাতে মনে হয়েছে জাতীয় পরিসংখ্যানের সুস্থতা ফিরে এসেছে। বিবিএস-এর বিশ্বাসযোগ্যতা বেড়েছে। এর মাধ্যমে জাতীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব একমাত্র বিবিএস-এর করা উচিত, তা পুনঃস্থাপিত হয়েছে।

তিনি বলেন, সম্প্রতি ১ হাজার ৬০০ পরিবারের ওপর জরিপ চালিয়েছি, তাতে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, ৮০ দশমিক ৬০ শতাংশ মানুষ খাদ্যের ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। ৬৪ দশমিক ৫০ শতাংশ মানুষ অন্যান্য ব্যয় কমিয়েছে। ঋণ নিচ্ছে ৬০ দশমিক ৮০ শতাংশ। ৪৭ দশমিক ২০ শতাংশ প্রোটিন খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। তারা আর মাছ-মাংস খাচ্ছে না। কেউ কেউ তিন বেলার বদলে এক বেলা বা দুই বেলা খাচ্ছেন। ১০ শতাংশ মানুষ শিশুখাদ্যও কমিয়ে দিয়েছে।

দেবপ্রিয় বলেন, সরকার সাম্প্রতিককালে ২০২০-২১ সালে প্রণোদনার যে বড় হিসাবটা ঢুকিয়েছে, এর ভেতরে এমন সব প্রকল্প আছে যেগুলো আদৌ প্রণোদনা হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার একটা বড় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প করেছে। এটাকে প্রণোদনা হিসাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এটা সরকারের সাধারণ উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ। সরকার যে ধান-চাল সংগ্রহ করে, সেটাকে প্রণোদনা হিসাবে দেখাতে চায়, আমি এটা গ্রহণ করতে রাজি না।

স্বাধীনতার ৫০ বছর উপলক্ষ্যে সরকার এই মুহূর্তে ঘর নির্মাণ করছে, এটাকে প্রণোদনার মধ্যে ঢোকানো হচ্ছে, এটা আদৌ কোভিড প্রণোদনার অংশ হতে পারে কি না, যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

কোভিড পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বাস্থ্য খাত ঢেলে সাজাতে একটি স্বাস্থ্য কমিশন গঠনের সুপারিশ করেন নাগরিক প্ল্যাটফরমের কোর গ্রুপের সদস্য ও স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞ মুশতাক রাজা চৌধুরী। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষকদের টিকার আওতার আনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কত শতাংশ শিক্ষক টিকা পেলেন, তা তদারকিতে আনতে হবে। কারণ, সব শিক্ষককে টিকার আওতায় আনতে না পারলে কীভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কথা বলি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাজেটের অর্ধেক বরাদ্দ হলো সরকারি কেনাকাটা।

সরকারি ক্রয় খাত রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের কাছে জিম্মি হয়ে আছে।

কোভিডের কারণে গরিব পরিবারের আয় কমেছে, তারা আরও গরিব হয়েছে বলে মনে করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশেষ ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, প্রবৃদ্ধির ধরন দেখলে বোঝা যায় বৈষম্য বাড়ছে। প্রবৃদ্ধিতে স্বল্প আয়ের মানুষের অংশগ্রহণ কমেছে। ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেন, ছোট ও মাঝারি শিল্প মাসের পর মাস পরিচালনায় নেই, যা কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

নাগরিক প্ল্যাটফরমের কোর গ্রুপের সদস্য সুলতানা কামাল বলেন, ‘আশা করেছিলাম এবার পুনরুদ্ধারের বাজেট হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য তেমন কিছু নেই।’

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.