মো.মুজিব উল্ল্যাহ্ তুষার: দেশের প্রতিটি নাগরিকই ভোক্তা। এমনকি যে শিশুটি মায়ের গর্ভে এখন আছে, সেই শিশুটিও একজন সম্মানিত ভোক্তা। সুতরাং মায়ের গর্ভের শিশুটিসহ আমাদের দেশের ভোক্তার সংখ্যা জনসংখ্যারও বেশি।
ভোক্তা অধিকার কি তা জানতে হলে, ভোক্তা কে তা জানতে হবে। ভোক্তা হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি টাকার বিনিময়ে কোন কিছু জিনিসপত্র ক্রয় করেন বা সেবা ক্রয় করেন। কোন ভোক্তা কোন সেবা বা কোন পণ্য বা জিনিস ক্রয় করার সময় প্রতারিত হলে তার অধিকার লঙ্ঘিত হয়। সুতরাং ভোক্তা হিসেবে যেসব অধিকার পাওয়া যায়, সে অধিকারগুলি হল ভোক্তা অধিকার। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, একজন ব্যবসায়ী নিজেও ভোক্তা ,কারণ তিনি নিজেও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা ক্রয় করে থাকেন।
২০০৯ সালে বাংলাদেশ সরকার ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ পাস করেন। এই আইনটি দ্বারাই আমাদের দেশে ভোক্তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে। ভোক্তা অধিকার আইন, ২০০৯ অনুসারে ভোক্তার অধিকারগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
* ধার্যকৃত মূল্য অপেক্ষা অধিক মূল্য কোন ব্যবসায়ী ভোক্তার নিকট থেকে নিতে পারবেন না।
* মোড়কজাত বা প্যাকেটজাত পণ্যে প্যাকেট জাতকরণের তারিখ, উৎপাদনের তারিখ, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য, মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ, ব্যবহারবিধি ইত্যাদি লিখা থাকতে হবে।
* প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে প্রদান করতে হবে।
* অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়ায় খাদ্যদ্রব্য প্রক্রিয়াকরণ করা যাবে না।
* মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষধ বিক্রি করা যাবে না।
* নকল ঔষধ বিক্রি বা উৎপাদন করা যাবে না।
* দৃশ্যমান স্থানে মূল্য তালিকা টাঙিয়ে রাখতে হবে।
* মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা ক্রেতাকে প্রভাবিত করা যাবে না।
* মানুষের জীবনহানি বা স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয় হয় এমন কাজ করা যাবে না।
একজন ভোক্তা হিসেবে প্রত্যেকটি নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে। ভোক্তা কোন কিছু ক্রয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই দেখে, শুনে, বুঝে ক্রয় করবেন। এভাবে পণ্য ক্রয় করার পরেও ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভোক্তা অধিকার আইনে মামলা বা অভিযোগ করা যায়।
রাষ্ট্র একজন ভোক্তার অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করেছে। এ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বা উপ-পরিচালক বা সরকারি পরিচালকগণের নিকট অভিযোগ দায়ের করা যায়। অভিযোগ বা মামলা দায়ের করার সময় কোন উকিলের দরকার হয় না। একটি সাদা কাগজে ভোক্তা তার নিজের নাম, পিতার
নাম, মাতার নাম,বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা এবং অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের নাম ও ঠিকানা লিখে ডাকযোগে বা কুরিয়ার যোগে বা ই-মেইলের মাধ্যমে অভিযোগ করতে পারেন। অভিযোগ করার সময় অবশ্যই প্রমাণ হিসাবে পণ্য ক্রয়ের রশিদ বা ভিডিও সংযুক্ত করতে হবে।
গণমাধ্যমকে সমাজের দর্পণ বলা হয়। একটি সমাজে যতগুলো অপরাধ সংঘটিত হয় তার মধ্যে ভোক্তার অধিকারগুলোর লংঘন অন্যতম। গণমাধ্যমগুলো ভোক্তাদেরকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নিতে পারে-
* প্রিন্ট মিডিয়া ভোক্তা অধিকার আইন সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।
* একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর প্রিন্ট মিডিয়াগুলো টকশোর আয়োজন করতে পারে।
* রেডিওগুলো ভোক্তাদের সচেতন করার জন্য মাঝে মাঝে বুলেটিন প্রকাশ করতে পারে।
* বেসরকারি ও সরকারি টেলিভিশন গুলো ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কাজগুলো প্রচারের মাধ্যমে ভোক্তাদেরকে আরো দায়িত্বশীল হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
বিশেষ করে কোন ভোক্তা ভোক্তা -অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করলে এবং অভিযোগটি প্রমাণিত হলে জরিমানার যে ২৫ শতাংশ অর্থ পান তা ব্যাপকহারে প্রচার করতে হবে।
ভোক্তা অধিকার একটি নাগরিক অধিকার। ভোক্তা অধিকার কারো দয়া বা করুণা নয়। বাংলাদেশের সকল ভোক্তার অধিকার সুনিশ্চিত করতে হলে গণমাধ্যম সহ সকলকে গণসচেতনমূলক কর্মসূচি গ্ৰহণ করতে হবে। ভোক্তা অধিকারের বিষয়টি ফেসবুক, ইউটিউব ইত্যাদি গণমাধ্যমে প্রচার করতে হবে।
(সাংবাদিক, সংগঠক ও মানবাধিকার কর্মী)