Sunday, September 13

শিশু রাইফার মৃত্যু, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জমা
ম্যাক্স হাসপাতালের অবহেলা ও গাফেলতির প্রমান মিলেছে

0

চট্টগ্রামে নগরীর মেহেদীবাগের ম্যাক্স হাসপাতালে সাংবাদিক কন্যা রাইফা খানের মৃত্যুর বিষয়ে গাফেলতি হয়েছে বলে তদন্তে রিপোর্টে উঠে এসেছে।

ম্যাক্স হাসপাতালে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায় রাইফার মৃত্যুর অভিযোগ ওঠার পর স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) অধ্যাপক ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি পরিদর্শন দল চট্টগ্রাম আসে। পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিদর্শন দল হাসপাতালটির ১১টি অনিয়ম চিহ্নিত করেছে। আগামী ১৫ কর্ম দিবসের মধ্যে লাইসেন্স ও চিকিৎসক-নার্স নিয়োগের সব তথ্য দিতে নোটিশ দেয়া হয়েছে।

হাসপাতালটি পরিদর্শন করার পাশাপাশি রাইফার বাবা-মা, দায়িত্বরত চিকিৎসক-নার্স এবং সাংবাদিক ও চিকিৎসক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলেন পরিদর্শন দলের সদস্যরা।

ম্যাক্স হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দিয়েছে পরিদর্শক দল। অধ্যাপক ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে ম্যাক্স হাসপাতালের ১১টি অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে।

চট্টগ্রামে সিভিল সার্জেনের নেতৃত্বে গঠিত ৫ সদস্যের কমিটি বৃহস্পতিবার রাতে তদন্ত রিপোর্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালায়ের মহাপরিচালকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী। তিনি জানান, আমরা তদন্ত রিপোর্টের অনুলিপি বিএমএ’র সভাপতি ও প্রেসক্লাব সভাপতির বরাবরে হস্তান্তর করেছি। তবে তদন্ত রিপোর্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এটি আমরা মিডিয়ার কাছে প্রকাশ করছি না।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত কমিটির এক সদস্য জানান, পাচঁ দিনের তদন্তে আমরা চিকিৎসক, সাংবাদিক, নিহত রাইফার পরিবার, ম্যাক্স হাসপাতালে ঘটনার দিন দায়িত্বে থাকা নার্স, চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ এবং ম্যাক্স হাসপাতালে মালিক পক্ষের সাথে কথা বলে তদন্ত রিপোর্ট তৈরী করেছি। এতে ম্যাক্স হাসপাতালে শিশুর রাইফার মৃত্যুতে অবহেলা ও গাফেলতির প্রমাণ মিলেছে।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ জুন বৃহস্পতিবার গলা ব্যাথার অসুস্থতা নিয়ে দৈনিক সমকালের সিনিয়র রিপোর্টার রুবেল খানের আড়াই বছরের শিশু কন্যা রাইফা খানকে নগরীর মেহেদীবাগস্থ ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি করায়। সেখানে একজন শিশু বিশেষজ্ঞের তত্ববধায়নে থাকাবস্থায় পরদিন শুক্রবার রাতে প্রচন্ড খিচুনী দিয়ে রাইফার মৃত্যু হয়। তার পরিবার থেকে অভিযোগ তোলা হয় কর্তব্যরত চিকিৎসক নার্সদের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় রাইফার মৃত্যু হয়েছে।

রাতে এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সাংবাদিক নেতারা হাসপাতালে ছুটে যায়। এ নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে সাংবাদিকদের বিরোধ দেখা দিলে পুলিশ নার্স চিকিৎসকসহ ৩ জনকে থানায় ধরে নিয়ে যায়। খবর পেয়ে চিকিৎসকদের নেতা বিএমএর সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সাল ইকবাল থানায় ছুটে যান এবং ওসির কাছে কৈফিয়ত চান কেন ৩ জনকে আটক করা হলো।

এসময় চকবাজার থানায় উপস্থিত সাংবাদিক নেতাদের সাথে বিএমএ নেতাদের তুলুম বিতর্ক চলে। পরে পুলিশ চিকিৎসক ও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে সেখানে ৫ সদস্যের এ তদন্ত টিম গঠন করা হয়।

এদিকে সাংবাদিকদের নিয়ে বিএমএ নেতাদের অশালীন সন্তব্য নাজেহাল করার চেষ্টার প্রতিবাদে চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজ আন্দোলনে শুরু করে। তারা ম্যাক্স হাসপাতাল বন্ধ, অভিযুক্তদের বিচার এবং বিএমএর নেতা ডা. ফয়সল ইকবালে সনদ বাতিল ও বিএমএ থেকে বহিস্কারের দাবীতে সভাসমাবেশ বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছেন।

এদিকে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনের মাধ্যমে পরদিন হাসপাতালে নোটিশ পৌঁছে দেয়া হয়। অনিয়মগুলোর মধ্যে রয়েছে- ম্যাক্স হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়নের আবেদন বিধি মোতাবেক করা হয়নি, হাসপাতালটি ১৫০ শয্যার হলেও চিকিৎসক-নার্সদের নিয়োগপত্র নেই, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তালিকা নেই, ক্লিনার ও কর্মচারী নিয়োগের তথ্য নেই, প্যাথলজিক্যাল ল্যাবের লাইসেন্স বিধি মোতাবেক নবায়ন করা হয়নি, প্যাথলজিস্ট, রিপোর্ট প্রদানকারী চিকিৎসক ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টের তালিকা নেই। এছাড়া হাসপাতালটিতে ব্লাড ব্যাংক নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আগামী ১৫ কার্য দিবসের মধ্যে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিবেদনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সাংবাদিক নেতারা বলেন, হাসপাতালটি যে অবৈধ তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে।

তারা বলেন, ম্যাক্স হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশু রাইফাকে হত্যা করেছে। ওই হাসপাতালের অপচিকিৎসায় যেন আর কারও মৃত্যু না হয় সেজন্য হাসপাতালটি অবিলম্বে বন্ধ করে দিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে দাবি জানান তারা।

চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি কলিম সরওয়ারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নাজিমুদ্দিন শ্যামল ও সাধারণ সম্পাদক হাসান ফেরদৌস, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শুকলাল দাশ।

সাংবাদিক নেতারা বলেন, আমরা চিকিৎসকদের বিপক্ষে নই। রাইফার ভুল চিকিৎসার সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি করছি। এ নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) নানা উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে চিকিৎসকদের সাংবাদিক ও জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চাইছে। এটি কাম্য নয়।

বুধবার মধ্যরাতে বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার এক বৈঠকে ড্যাব ও বিএনপি নেতা ডা. খুরশিদ জামিল সাংবাদিকদের ‘মার দিতে হবে’ বলে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন- যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এর আগে বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী সাংবাদিকের সন্তানদের চিকিৎসা না করার হুমকি দেন।

সাংবাদিক নেতারা বলেন, এসব হুমকিতে সাংবাদিকরা ভীত নন। রাইফা হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.