আওয়ামী লীগ আমলে টানা ১৪ বছর দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর বিরুদ্ধে ছিল সব ধরণের অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ। এসব কর্মকাণ্ডের বড় দোসর ছিলেন আধুনিক ভাষা ইন্সটিটিউটের উপপরিচালক অনুপ কুমার চ্যাটার্জী। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের মাত্র একবছর আগে গা বাঁচাতে বদলি নেন তিনি। একারণে তিনি সবসময় থেকে যান লোকচক্ষুর আড়ালে।
এখনও আছে বহাল তরবিয়তে।
২০১৩ সালে প্রভাব খাটিয়ে একাডেমিতে কালচারাল অফিসার হিসাবে নিয়োগ পেয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল শাখার ছাত্রলীগের নেতা অনুপ চ্যাটার্জী। নিয়োগ প্রাপ্তির পর জেলায় না গিয়ে ঢাকায় থেকে হয়ে ওঠেন লাকীর ডান হাত এবং বিধিবর্হিভূতভাবে বাগিয়ে নেন সহকারী সচিব পদ। ওই পদে থাকাকালে সব ধরনের টেন্ডার ও কেনাকাটা করেছেন তিনি।আর এ থেকে লিয়াকত আলী লাকীকে একটি বড় অংশের ভাগ দিতেন এই অনুপ। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ছত্রছায়ায় লাকীকে দীর্ঘ ১৪ বছর সব ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতিতে সহযোগিতা করেছেন এই মাস্টারমাইন্ড অনুপ চ্যাটার্জী।
লাকীর মাস্টারমাইন্ড অনুপ চ্যাটার্জী দীর্ঘদিন ছিলেন লোকচক্ষুর আড়ালে। তিনি কখনই লাকী ছাড়া অন্য কোনো কর্মকর্তাকে গুরুত্ব দিতেন না।
লাকীকে রাজনৈতিক ছত্রছায়া দিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক উপ-কমিটির সদস্য হিসাবে পদ বাগিয়ে দিতে সহায়তা করেন অনুপ। পদ পাওয়ায় আরো বেশি রাজত্ব করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বদলি ও অন্যান্য কাজে। লাকীর মাস্টারমাইন্ড হওয়ায় একই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেন তার আপন ভাইসহ আউটসোসিং এর বেশকিছু কর্মচারিকে। একাডেমি ও মন্ত্রণালয়ের যেসব কর্মকর্তা লাকীর এসব অনিয়ম মেনে নিতে চায়নি তাদের চাপে রাখতে যত রকম উড়ো চিঠি আসত তার সবই তৈরি হতো মাস্টারমাইন্ড অনুপ চ্যাটার্জীর অফিস কক্ষে।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে থাকা অবস্থায় লাকীর মাস্টারমাইন্ড হওয়ায় এবং নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখতে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন সময় কারণ দর্শানোর নোটিশ নিজেই গ্রহণ করতেন।
মন্ত্রণালয় থেকে কালচারাল অফিসারদের বদলিতে তার নাম না থাকায় ১৪ বছরের মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীকে দিয়ে তড়িঘড়ি করে প্রথমে মাগুরা জেলায় বদলি নেন অনুপ। মাগুরা জেলাতে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি ভ্যাট ও আয়করের অর্থ আত্মসাতের দায়ে তার নামে অডিট আপত্তি চলমান রয়েছে। নিজেকে আওয়ামী লীগের খাদ্যমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ ও পঙ্কজ দেবনাথের আত্মীয় বলে পরিচয় দিতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল শাখার ছাত্রলীগের নেতা অনুপ।
অডিট আপত্তি চালু হওয়ার পর তিনি একাডেমি থেকে চাকরি ছেড়ে দেন। তারপরও লাকীর মাস্টারমাইন্ড হিসাবে এখনো একাডেমিতে নিয়মিত রাজত্ব করে চলছেন অনুপ চ্যাটার্জী। স্বৈরাচার শেখ হাসিনার আমলের শেষের দিকে নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির মাধ্যমে আধুনিক ভাষা শিক্ষা ইনস্টিটিউটের সচিব পদে যোগ দেন অনুপ। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকাদারি কাজসহ সব কাজে হস্তক্ষেপ করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। জানা যায়, গত ৬ অক্টোবর শিল্পকলা একাডেমির নিয়োগ জালিয়াতি মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যে অভিযোগ করেছে সেই নিয়োগের চাকরিপ্রার্থীদের অনেকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনে সমন্বয় করেছেন এই মাস্টারমাইন্ড অনুপ চ্যাটার্জী।
জানা গেছে, গত ৫ আগস্টে শেখ হাসিনা পালানোর পর লিয়াকত আলী লাকী মাস্টারমাইন্ড অনুপ চ্যাটার্জীর গ্রামের বাড়ী ঝিনাইদহের কালিগঞ্জে অবস্থান করে বার বার ভারতে পালানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। পরে যৌথবাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে অনুপ চ্যাটার্জীর সহযোগিতায় আবার ঢাকায় ফিরে আসেন। বর্তমানে লাকী বাংলাদেশেই অবস্থান করছেন। সম্প্রতি অবৈধভাবে চাকরি পাওয়া কর্মকর্তা ও শিল্পীরা চাকরির জন্য দেওয়া অর্থ ফেরত চাইতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা শিক্ষা ইনস্টিটিউটে গেলে ভোল পাল্টে ফেলেন অনুপ চ্যাটার্জী। বিএনপিতে তার লোক আছে বলে তিনি হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অনুপ চ্যাটার্জীর হাতে বিভিন্ন সময়ে ক্ষতিগ্রস্তরা বর্তমান সরকারের কাছে বিচার চেয়ে একাধিক অভিযোগ দায়ের করেছে।