রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা ছিল আজ। কিন্তু টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মিয়ানমারের নাগরিকরা স্বদেশে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানান।
প্রথম দফায় প্রত্যাবাসনের জন্য কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে টেকনাফের উনচিপাং এলাকার ২২ নম্বর ক্যাম্পে জড়ো করার পর তারা ‘ন যাইয়ুম, ন যাইয়ুম’ (যাব না, যাব না) স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন। সেখানে ফিরে গেলে তারা আমাদের নির্যাতন করে মেরে ফেলবে।আমরা কিছুতেই সেখানে ফিরে যাব না।
ওই ক্যাম্প থেকে আগামী তিন দিনে প্রত্যাবাসিত হওয়ার জন্য ২৯৮ রোহিঙ্গার একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছিল।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সেখানে উপস্থিত রোহিঙ্গাদের জানানো হয় যে, তাদের জন্য অন্তত তিন দিনের খাবার-দাবার ও জরুরি প্রয়োজনের দ্রব্যাদিসহ বাসে করে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়।
এর পর তাদের বাসে ওঠার আহ্বান জানালে মিয়ানমারে যাব না বলে স্লোগান দেয়া শুরু করেন।
বেলা দেড়টার দিকে সেখানে শত শত রোহিঙ্গাকে বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। সেখানে র্যাব, পুলিশ, বিজিবি সদস্য মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যেও রোহিঙ্গারা স্লোগান দিচ্ছেন।
বিক্ষোভ প্রদর্শনের সময় কয়েকজনের হাতে প্ল্যাকার্ড দেখা যায়; যেখানে তারা মিয়ানমারের নাগরিকত্ব প্রদান, নিরাপত্তার নিশ্চয়তাসহ পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন।
প্রসঙ্গত, গেল বছরের ২৪ আগস্ট নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর রাখাইনে পূর্ব পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। নিপীড়নের মুখে গেল বছরের ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। এর আগে থেকে আশ্রয় নেওয়াসহ ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩০টি ক্যাম্পে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করছে। এই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে গেল ২০১৭ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়।
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দুই দেশের সমন্বয়ে গঠিত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের সভায় একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করা হয়। স্মারকের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ মিয়ানমারের কাছে আট হাজার রোহিঙ্গার তালিকা পাঠায়। যাচাই-বাছাই শেষে মিয়ানমার ওই তালিকা থেকে ৫ হাজার ৫শ’ জনকে প্রত্যাবাসনের ছাড়পত্র দেয়।
গেল ৩০ অক্টোবর জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের সভায় প্রথম ধাপে ২ হাজার ২৫১ জন রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিদিন ফেরত নেওয়া হবে ১৫০ জন রোহিঙ্গাকে। প্রথম ধাপের প্রত্যাবাসন কার্যক্রম আজ ১৫ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। প্রত্যাবাসনের জন্য টেকনাফের কেরুনতলী ট্রানজিট ক্যাম্প প্রস্তুত করা হয়েছে। অন্যদিকে, বান্দরবানের ঘুমধুমে আরও একটি ট্রানজিট ক্যাম্প প্রায় সম্পন্নের পথে।
এদিকে, প্রত্যাবাসনের জন্য তৈরি করা তালিকায় থাকা রোহিঙ্গারা জানান, মিয়ানমারের ফেরার বিষয়টি কিছু দিন আগে তারা জেনেছেন। তবে কীভাবে এবং কখন যেতে হবে, সে সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই। মিয়ানমারের অবস্থান সম্পর্কেও নূন্যতম ধারণা তাদের দেয়া হয়নি। এ কারণে অনেকেই ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে গেছে। যতদিন পর্যন্ত মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, বসতভিটা, জমিজমা ফিরিয়ে না দেবে, ততদিন পর্যন্ত তারা মিয়ানমারে ফিরে যাবেন না।