Wednesday, September 16

হাসপাতালেই যেন ময়নার শেষ ঠিকানা

0

আরিফুল ইসলাম সুজন কুড়িগ্রাম থেকে : কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার নয়ার হাট ইউনিয়নের গয়নার পটল চর নামক এলাকার বাসিন্দা ময়না বেগম। এক সময় স্বামী সংসার নিয়ে খুব সুখে শান্তিতেই দিন কাটতো ময়নার। ময়না বেগম গয়নার পটল চরের বাসিন্দা হলেও বর্তমানে চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই যেন তার শেষ ঠিকানা। প্রায় দুবছর ধরে তিনি এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন। সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ময়নার স্বামী তারেক রহমান দুই বছর আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় এক ছেলে ও এক মেয়েকে রেখে । মেয়ের বিয়ে হয়েছে আর একমাত্র ছেলে এসএসসি পরীক্ষা দেবে। ব্রহ্মপুত্রে বাড়িঘর হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে ভাই আব্দুল গফুরের কাছে থাকছিলেন ময়না বেগম। নিঃস্ব ময়নার চিকিৎসার খরচ বহন করতেন তার মেয়ের জামাই। কিন্তু শেষ পর্যায়ে চিকিৎসা খরচ চালাতে গিয়ে মেয়ের জামাইও এক পর্যায়ে হয়ে পড়েন নিঃস্ব। এখন হাসপাতালেই যেন তার শেষ ভরসা ।
প্রায় দুই বছর থেকে এই হাসপাতেলেই মানবেতর জীবন যাপন করছে ময়না বেগম। এখন তাঁর শরীরের বিভিন্ন অংশে পঁচন ধরে খসে খসে পড়ছে এবং তা থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। আর এ কারণে তাঁর ধারের কাছেও কেউ ভিড়তে চায় না। স্বজনরাও খোঁজখবর নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ প্র্রতিদিনই কমপক্ষে এক হাজার টাকার ওষুধ লাগে তাঁর।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ মোস্তারী বেগমের আর্থিক সহযোগিতায় কোনো রকমে চলছে তাঁর চিকিৎসা। অর্থ সংকটে উন্নত চিকিৎসাও নিতে পারছেন না ময়না বেগম। ছয় মাস আগে তাঁর শারীরিক অবস্থার অনেক অবনতি হয়। একপর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে পড়লে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে তাঁর স্বজনদের ডেকে দ্রুত তাঁকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু টাকার অভাবে রংপুরে না নিয়ে তাঁকে বাড়িতে নেয়া হয়। পাঁচ দিনেও জ্ঞান না ফেরায় স্বজনরা ধরে নেয় তিনি মারা গেছেন। তাঁকে মৃত ভেবে দাফন-কাফনের ব্যবস্থা নেয়া হয়। কিন্তু হঠাৎ নড়ে ওঠেন ময়না। পরে স্বজনরা আবারও তাঁকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নারী ওয়ার্ডে গেলে ময়না জানান, স্বামী তারেক রহমান দুই বছর আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এক ছেলে ও এক মেয়ে তাঁর। মেয়ের বিয়ে হয়েছে আর একমাত্র ছেলে এসএসসি পরীক্ষা দেবে। ব্রহ্মপুত্রে বাড়িঘর হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে ভাই আব্দুল গফুরের কাছে থাকি। ‘জমাজমি বলতে কিছুই নেই। কোনো টাকা-পয়সাও নেই। এযাবৎ চিকিৎসার খরচ দিয়ে আমার মেয়ের জামাইও এখন নিঃস্ব। ভাই আব্দুল গফুর কামলা দিয়া খায়। তার ওপর আমার ছেলেটার খাবার খরচ দেয়। টাকার অভাবে চিকিৎসা হচ্ছে না। এত কষ্ট আর সহ্য হয় না। আল­াহ আমাকে নিয়া গেলেই বাঁচি। দুর্গন্ধে কেউ কাছে আসতে চায় না। দুই বছর ধরে হাসপাতালই আমার ঘর-সংসার।’
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ মোস্তারী বেগম জানান, ‘ময়না বেগমের রোগকে কুশিন সিনড্রোম বলা হয়ে থাকে। এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। তবে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দিলে সুস্থ্য হয়ে উঠবে রোগী। আমরা বার বার রোগীকে রংপুর কিংবা ঢাকায় নিতে বলছি। কিন্তু রোগীর স্বজনরা এতই গরিব যে সেটা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে স্বজনরা রোগীর কোনো খোঁজখবর নিচ্ছে না। এ অবস্থায় আমরা কিছু টাকা তুলে ওষুধ কিনে চিকিৎসা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। দুই বছরের বেশি সময় ধরে ময়না বেগম এখানে আছে। এখানে থাকলে সম্পূর্ণরূপে সুস্থ্য হয়ে ওঠা সম্ভব নয়।’
এ দিকে ময়না বেগমের শরীরের অবস্থা দিনদিন নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। রোগ শোকে ক্লান্ত ময়না আর দশজনের মতো ফিরে পেতে চায় স্বাভাবিক জীবন। এজন্য প্রয়োজন বিত্তবানদের আর্থিক সহযোগীতা। অর্থের সংস্থান হলে উপযুক্ত চিকিৎসা নিয়ে ময়না হয়ে উঠতে পারেন সুস্থ্য, ফিরে পেতে পারেন সোনালী দিনগুলো।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.