Tuesday, August 25

১৬ শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে ৪ শিক্ষক, রাস্তা না থাকলেও দ্বিতল ভবন

0

লালমনিরহাট প্রতিনিধিঃ লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার নামুড়ী বালিকা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র ১৬ জন শিক্ষার্থীর পাঠদানের জন্য শিক্ষক রয়েছেন ৪ জন। যাতায়তের রাস্তা না থাকলেও বিদ্যালয়টি দ্বিতল ভবন করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার(১৭ অক্টোবর) সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়টির ৩য় শ্রেনীতে মাত্র ৪জন, ৪র্থ শ্রেনীতে ৪জন ও ৫ম শ্রেনীতে ৮জন মিলে মোট ১৬জন শিক্ষার্থী উপস্থিত। যারা পাঠদান ছেড়ে মাঠে খেলছিল। প্রধান শিক্ষক হাজিরায় স্বাক্ষর করে চলে যান বাহিরে। বাকী তিনজন শিক্ষকের একজন অফিস কক্ষে ঘুমালেও অন্য দুইজন বাহিরে আড্ডায়। সাংবাদিকদের ছবি তুলতে দেখে শিক্ষকরা তারাগুড়া করে শিক্ষার্থীদের নিয়ে দৌড় দিলেন ক্লাশে।

শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়রা জানান, উপজেলার পলাশী ইউনিয়নের নামুড়ী গ্রামে ১৯৮৮ সালে নামুড়ী বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিরা। প্রতিষ্ঠাকালিন সময় পড়াশোনার মান ভাল থাকায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পায়। পরবর্তিতে প্রধান শিক্ষক বীরেন্দ্র নাথ সরকার ওরফে শিয়ালু’র এক আধিপত্তের কারনে নিম্নমুখি হয়ে পড়ে শিক্ষার মান ও পরিবেশ। বাধ্য হয়ে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের পাশের বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন। বর্তমানে কাগজ কলমে ১৩৭ জন শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে মাত্র ১৬/২০ জন।

যোগাযোগ রাস্তা না থাকলেও ক্ষমতাশিন দলের নেতা প্রধান শিক্ষক ক্ষমতা আর অবৈধ সুযোগ দিয়ে বিদ্যালয়টির রেজিস্ট্রেশন করেন এবং স্ত্রী সুজাতা রানীকে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। ২০০২ সালে দ্বিতল ভবনের বরাদ্ধ নিয়ে ভবন করেন। কিন্তু নেই পাঠদানের কোন পরিবেশ। পরবর্তিতে ২০১৩ সালে জাতীয় করন করা হয় এ বিদ্যালয়টি। জাতীয় করনের পরে প্রতিষ্ঠাকালিন তিন শিক্ষকের বদলি হলেও প্রধান শিক্ষক বীরেন্দ্রনাথ সস্ত্রীক রয়েছেন বহাল তবিয়তে। ফলে তাদের নিজেস্ব গড়া নিয়ম নীতিতেই চলে বিদ্যালয়ের পাঠদান।

বিদ্যালয় ঠিকিয়ে রাখতে পাশের বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী এবং ভুয়া কিছু নাম দিয়ে শিক্ষার্থীর হাজিরা খাতা তৈরী করেছেন এবং সে অনুযায়ী ভোগ করেন যাবতীয় সরকারী সুযোগ সুবিধা। বাঁশ বাগানের ভিতর ও ধান ক্ষেতে আইল দিয়ে বিদ্যালয়ের যোগাযোগ। নেই মুল ফটক। তথ্যের ডিসপ্লেবোর্ড থাকলেও নেই কোন তথ্য। প্রবেশ পথেই বিপদজনক টয়লেটের খোলা ম্যানহোল। ঘটছে দুর্ঘটনা। সেদিকেও নজরদারী নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

৩য় শ্রেনীর শিক্ষার্থীরা জানায়, রুটিনে ক্লাশ শুরুর দুই ঘন্টা অতিবাহিত হলেও সংবাদকর্মীদের আগমনে শুরু হয় ক্লাশ। তাদের ৪জনকে নিয়েই ৩য় শ্রেনী। ৪র্থ ও ৫ম শ্রেনীর শিক্ষার্থীরাও জানালেন একই কথা। বার্ষিক পরীক্ষা আসন্ন হলেও এখন পর্যন্ত অনেক শিক্ষার্থী তাদের ক্লাশ রোল বলতে পারে নি। রোল কল তেমন একটা হয় না বলেই তারা তাদের রোল জানে না বলে দাবি শিক্ষার্থীদের।

কয়েকজন অভিভাবক জানান, প্রধান শিক্ষক ও তার স্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে চলে এ বিদ্যালয়। সবাই বদলি হলেও তাদের বদলি হয় না। আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী নেতা, এমপি, মন্ত্রীদের সাথে তার বেশ সখ্যতা থাকায় শিক্ষা অফিস ভুলেও এ বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন না। ফলে নিজেদের গড়া নিয়মে চলে বিদ্যালয়। উচ্চতর তদন্তের দাবি স্থানীয়দের।

প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা সহকারী শিক্ষক সুজাতা রানী জানায়, আগের তুলনায় পাঠদান ভালো হলেও রাস্তার অভাবে শিক্ষার্থীরা আসে না। শিক্ষার্থীরা বিলম্বে আসায় ছুটির আগে হাজিরা নেয়া হয়। বদলির চেষ্টা করেও তাকে বদলি করা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

উপজেলা শিক্ষা অফিসের একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিলে বড় নেতাদের ফোন আসে। তাই কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না। পাশেই একাধিক বিদ্যালয় তবুও এটি অনুমোদন দেয়া ঠিক হয়নি। রাস্তা ছাড়া বিদ্যালয়টির যারা অনুমোদন দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রধান শিক্ষক বীরেন্দ্র নাথ (শিয়ালু) বলেন, বিদ্যালয়ে হাজিরা দিয়ে বিদ্যালয়ের কাজে শিক্ষা অফিসে ছিলেন। পাঠদানের মানের জন্য নয়, রাস্তার অভাবে শিক্ষার্থী নেই। ভুয়া শিক্ষার্থী নেই। তবে যারা অনুপস্থিত তারা সবাই পরিবারের সাথে কাজের সন্ধানে এলাকার বাহিরে রয়েছে। বাড়ির পাশে হলেও বদলির চেষ্টা করেছি। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বদলি না করায় একই চেয়ারে কাটছে প্রায় ৩১ বছর। এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করতেও অনুরোধ করেন তিনি।

আদিতমারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এনএম শরীফুল ইসলাম খন্দকার জানান, বিদ্যালয়টির এমন করুন পরিস্থিতি তার জানা নেই। পরিদর্শন করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.