লালমনিরহাট প্রতিনিধিঃ
হটলাইন নম্বর ৩৩৩ কল করে তথ্য দিয়েও বাল্যবিয়ে রক্ষা করা যায়নি বাল্যবিয়ে মুক্ত জেলা লালমনিরহাটের ৮ম শ্রেনীর ছাত্রী ময়ুরী আক্তার মুক্তার(১৩) বিয়ে।
শুক্রবার(০৪ অক্টোবর) দিনগত রাতে আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের গন্ধমরুয়া গ্রামে প্রতিবেশীর বাড়িতে বিয়ে হয় তার। ময়ুরী আক্তার মুক্তা ওই গ্রামের মোক্তার আলীর মেয়ে। স্থানীয় গন্ধমরুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেনীর ছাত্রী।
স্থানীয়রা জানান, মন্ত্রী পরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম জেলার হাতীবান্ধা এসএস উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে গত ২০১৫ সালের ২৮ নভেম্বর আনুষ্ঠানিক ভাবে লালমনিরহাটকে বাল্যবিয়ে মুক্ত জেলা ঘোষনা করেন। তবুও থেমে নেই বাল্যবিয়ে। এক শ্রেনীর অসাধু ঘটক ও নিকাহ রেজিস্টার টাকার বিনিময়ে চালিয়ে যাচ্ছে বাল্যবিয়ে। প্রায় সময় ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে জেল জরিমানা করেও বাল্যবিয়ে রোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন জেলা প্রশাসন। প্রতিটি ইউনিয়ন নিকাহ রেজিস্টার অন্য পেশায় জড়িত থাকায় দুই/তিনজন করে সহকারী বা ভায়া নিকাহ রেজিস্টার রেখেছেন। যারা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বাল্যবিয়ে দিচ্ছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
শুক্রবার(০৪ অক্টোবর) রাতে এমনি ভাবে বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে ৮ম শ্রেনীর ছাত্রী ময়ুরী আক্তার মুক্তা(১৩)। মুক্তার প্রতিবেশী আলীর বাড়িতে আত্নীয় আসবে বলে আয়োজন চলে। হঠাৎ রাতে বরযাত্রী চলে আসে। পাশের বাড়ির ভায়া নিকাহ রেজিস্টার শরীফুল ইসলাম গোপনে বিয়ে রেজিস্ট্রি ও ধর্মীয় মতে পড়িয়ে চম্পট দেন বলে দাবি স্থানীয়দের। গ্রামবাসী বুঝতে পেয়ে হটলাইনের ৩৩৩ নম্বরে কল করে বিষয়টি অবগত করে। কিন্তু এক ঘন্টা আগে না জানানোর জন্য কোন সেবা দিতে পারবে না বলে দুঃখ প্রকাশ করেন ৩৩৩ নম্বরের সেবা প্রদানকারী রাহাত।
বাধ্য হয়ে গ্রামবাসী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) জয়শ্রী রানীকে অবগত করলে তিনি পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে বলেন। এরই মাঝে বিয়ের অনুষ্ঠানে গ্রামপুলিশ রবিউল ইসলাম ইউএনও’র আগমনের খবর দিলে বরযাত্রী কনে মুক্তাকে নিয়ে দ্রুত চলে যান। ইউএনও’র নির্দেশে অর্ধঘন্টা পরে থানা পুলিশ এসে ওই বাড়িতে বিয়ের আলামত পেলেও কাউকে পাননি। এভাবে সংগ্রাম করেও বাল্যবিয়ে রক্ষা করতে পারেননি বলে ক্ষোভ গ্রামবাসীর। এমনি ভাবে ওই এলাকায় বেশ কয়েকটি বাল্যবিয়ে রেজিস্ট্রি করায় ভায়া নিকাহ রেজিস্টার শরীফুলের বিরুদ্ধে দেড় বছর আগে জেলা প্রশাসক বরাবরে লিখিত অভিযোগ দেন এলাকাবাসী। কিন্তু তার কোন সুফল মেলেনি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
গ্রামপুলিশ রবিউল ইসলাম বলেন, থানা থেকে ফোনে বাল্যবিয়ের খবর নিতে বলায় আমি ওই বাড়িতে গিয়ে কয়েকটি গাড়ি দেখে তাদের বাল্যবিয়ে না দিতে বলি। পরে পুলিশ এসে বাড়িতে কাউকে পায়নি।
অভিযুক্ত ভায়া নিকাহ রেজিস্টার শরীফুল ইসলাম বলেন, আমার বাড়ি লাগোয়া পাশের বাড়ির মেয়ে মুক্তা ৮ম শ্রেনিতে পড়লেও জন্মসনদে তার বয়স ১৭ বছর ৬ মাস। বয়স ৬ মাস কম থাকায় বিয়ে রেজিস্ট্রি করিনি। পুলিশ আসায় বিয়েটা হয়নি বলে গ্রামপুলিশ মার্ফতে শুনেছি।
দুর্গাপুর ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্টার কাজী মাহমুদুল হাসান জুয়েল বলেন, গ্রামবাসীর কাছে বিষয়টি জানতে পেয়ে আমি নিজেও ইউএনও মহোদয় ও ৩৩৩ নম্বরে কল করে সহযোগিতা কামনা করি। তারপরেও স্কুলছাত্রীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। ভায়া নিকাহ রেজিস্টার শরীফুল ইসলাম গোপনে এভাবে বাল্যবিয়ে রেজিস্ট্রি করে আসছে অন্যের ভলিয়মে। বিষয়টি প্রশাসনকে একাধিকবার অবগত করা হলেও এই স্বঘোষিত ও ভায়া নিকাহ রেজিস্টারের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।
গন্ধমরুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আখলাতুল ইসলাম বলেন, মুক্তা ৮ম শ্রেনিতে পড়ে। পূজার ছুটিতে থাকায় বাল্যবিয়ের খবর পাইনি।
আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) জয়শ্রী রানী রায় বলেন, দুই উপজেলার পুজার দায়িত্বে থাকায় নিজে না গিয়ে পুলিশ পাঠিয়েছি। নিজে না গেলে বাল্যবিয়ে বন্ধ করাও সম্বব হয় না। তবে ভায়া নিকাহ রেজিস্টারসহ মুক্তার বাল্যবিয়ের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।