প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে দেশের কৃষি ব্যবস্থা

0

আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে পরিবর্তন ঘটছে কৃষিতে। উন্নত বিশ্বের হাওয়া লেগেছে বাংলাদেশেও।আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে কৃষি ব্যবস্থা। বীজতলা থেকে উৎপাদন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে রয়েছে প্রযুক্তির ব্যবহার।

জানা গেছে, কৃষি আধুনিকায়নের ফলে কম খরচেও উৎপাদন বেশি হচ্ছে। সাথে সাথে বাড়ছে আয়। দেশে এখন ৯০ শতাংশ কৃষি জমি তৈরির কাজ করছে ট্রাক্টর। ফলে ফসলের উৎপাদনও ১২ থেকে ৩৪ শতাংশ বেড়ে গেছে। বপন যন্ত্র ব্যবহারের ফলে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বীজ ও সার সাশ্রয় হচ্ছে।

যে লাঙল-জোয়াল আর হালের বলদ ছিল কৃষকের চাষাবাদের প্রধান উপকরণ সে জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে আধুনিক লাঙল ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, কম্বাইন্ড হার্ভেপার, ব্রডকাস্ট সিডার পাওয়ার রিপার মেশিন। এমনকি ফসল ফলানোর জন্য জমি চাষ, বীজ বপন, নিড়ানি, সার দেয়া, কাটা, মাড়াই, ফসল ঝাড়া ও প্যাকেটিং পর্যন্ত সব কিছুই করা হচ্ছে প্রযুক্তির ছোঁয়ায়। ফলে কৃষিতে উৎপাদন বাড়ছে, কমছে উৎপাদন ব্যয়। প্রযুক্তির ব্যবহারে ফসলের অপচয়ও কম হচ্ছে। ফলে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যন্ত্রাংশের ব্যবহারে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে। এখন কম জমিতে চাষাবাদ করে অনেক বেশি ফসল পাওয়া যাচ্ছে। আর এসব প্রযুক্তির বড় অংশই দেশে উদ্ভাবিত।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের মোট আবাদি জমির ৯০-৯২ ভাগ চাষ হচ্ছে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে। যদি চাষাবাদের সব পর্যায়ে অর্থাৎ জমি তৈরি থেকে শুরু করে চাল উৎপাদন পর্যন্ত পুরোপুরি আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় তাহলে রীতিমতো বিপ্লব ঘটবে কৃষিতে।
কৃষিবিদ ফজলুল হক বলেন, কৃষি যন্ত্রসামগ্রী নির্মাণ দেশের অর্থনীতি এবং কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এই খাতটি এখনো ভারি শিল্প হিসেবে চিহ্নিত। কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারক বা প্রস্তুুত শিল্পকে কৃষিভিত্তিক শিল্পের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। গ্রামীণ শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশ এখন কৃষিকাজ করে। এ হার ২০৩০ সালে ২০ শতাংশে নামবে। আগামী দিনে দেশে হারভেস্টর, ট্রান্সপ্ল্যান্টারের মতো কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়বে।
কৃষি স¤প্রসারণ অধিদফতর কৃষি মন্ত্রণালয়ের ‘খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি-দ্বিতীয় পর্যায়’ প্রকল্পের আওতায় ৫১ জেলায় কৃষক পর্যায়ে আধুনিক যন্ত্রপাতি প্রদর্শনীর মাধ্যমে সেগুলো জনপ্রিয় করার চেষ্টা হচ্ছে। জমি চাষ থেকে ফসল মাড়াই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হচ্ছে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি। এসব প্রযুক্তি সহজলভ্য ও জনপ্রিয় করতে এ প্রকল্পের মাধ্যমে ৫০ শতাংশ হারে ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। ধানের উৎপাদন বেড়েছে কয়েকগুণ। ধানের মতো গমের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। আলু, ভুট্টারও হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বেড়েছে।
ইয়ানমার কম্বাইন্ড হারভেস্টারের আমদানিকারক এসিআই মটরস। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস বলেন, এই হারভেস্টার মেশিনটি ধান কেটে মাড়াই, ঝাড়াই করে খড় আস্ত রাখে। ফলে ধান উৎপাদন এবং খড়ের চাহিদা রয়েছে এমন দেশগুলোতে এটি ব্যবহৃত হয়। তিনি আরও বলেন, কম্বাইন হারভেস্টারটি ঘণ্টায় এক একর ধান কেটে মাড়াই, ঝাড়াই করে বস্তাবন্দী করে দেয়।
ইয়ানমার কম্বাইন হারভেস্টারের একজন ব্যবহারকারী কুমিল্লার জেলার নাইমুল ইসলাম জানান, যন্ত্রটি ছয় মাস ধরে ব্যবহার করছি। এখন পর্যন্ত তিনশ’ একরের মতো ধান কাটা হয়েছে। যন্ত্রটি ভালো কাজ করছে। নাইমুল ইসলাম দেশের বিভিন্ন জেলায় হারভেস্টার পাঠিয়ে ধান কাটানোর কাজও করেন।
বাংলাদেশ এগ্রিকালচার মেশিনারিজ মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খন্দকার মনিউর রহমান জুয়েল বলেন, দেশীয় বাজারে প্রতি বছর ১০ হাজার কোটি টাকার কৃষি মেশিনারিজের চাহিদা রয়েছে। তবে কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরি ও রপ্তানিতে প্রচুর সম্ভাবনা থাকলেও, সরকারি সহায়তা নেই। তারপরও দেশে উন্নত মানের কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে। এমনকি চীনের চেয়েও উন্নত মানের মেশিনারিজ তৈরি করছে বাংলাদেশ।

কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি স¤প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের মতে, বোরো ধান সেচ, সার ও কীটনাশক নির্ভর। ফলে এর জন্য নিবিড় পরিচর্যা প্রয়োজন হয়। এতে খরচও বৃদ্ধি পায়। প্রতি বিঘা জমিতে বীজতলা তৈরি, চারা লাগানো, নিড়ানি দেয়া, ধান কাটা ও মাড়াইসহ ঘরে তোলা পর্যন্ত কৃষি মজুর লাগে ২৫ জন। বীজের দাম, সারের দাম, তিনবার সেচ দেয়া, দু’বার কীটনাশক প্রয়োগ করা ও জমির ভাড়াসহ (বা খাজনা) এক বিঘা জমিতে ধান চাষে খরচ পড়ে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ টাকা। এক বিঘা জমিতে গড়ে ফলন হয় ১৮ থেকে ২০মণ ধান।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ফসল কাটা ও ফসল বপনসহ সিজনের সময় শ্রমের যে মজুরি কৃষককে গুণতে হয় তাতে যন্ত্র ছাড়া কোনো উপায় নেই। কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে যেমন অর্থ সাশ্রয় হয়, তেমনি সময় ও শ্রম সাশ্রয় হয়। কৃষিকাজে সবচেয়ে শ্রম ও সময়নির্ভর কাজ হচ্ছে চারা রোপণ বীজ বপন ও ফসল কর্তন।

গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক প্রকৌশলী মো. হাসান সোহেল বলেন, কৃষি ষান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে দানা শস্যের উৎপাদন আরও বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। উন্নত কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রযুক্তি প্রয়োগে শস্য উৎপাদনের কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রাপ্ত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও ফসল কর্তনোত্তর ক্ষতি কমানোর মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। যান্ত্রিকীকরণের বহুবিধ সুবিধাদির ফলে কৃষক দিন দিন কৃষিযন্ত্রের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.