মিসরের উত্তর সিনাইয়ে জুম্মার নামাজের সময় মসজিদে জঙ্গি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩০৫-এ পৌঁছেছে। নিহতদের মধ্যে ২৭টি শিশুও রয়েছে।
হামলাকারীদের হাতে কালো পতাকা ছিল। এছাড়া হামলার সময়কার বর্ণনা করেছেন মনসুর নামে একজন প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি বলেন, ‘সে সময় হামলাকারীরা আল্লাহু আকবর বলে চিৎকার করছিল, শিশুরা কাতরাচ্ছিল। ‘
গত শুক্রবার জুমার নামাজের সময় এই হামলা হয়। গতকাল শনিবার পর্যন্ত কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার করেনি।
সরকারপক্ষের এক বিবৃতিতে গতকাল জানানো হয়, উত্তর সিনাইয়ের রাজধানী আল-আরিশের কাছে বির আল-আবেদ শহরে রাওদা রাওদা মসজিদে হামলায় ৩০৫ জন নিহত ও ১২৮ জন আহত হয়েছে। শুক্রবার সারা রাত নিহতদের দাফন করা হয়। অনেক লাশ রক্তাক্ত অবস্থায়ই দাফন করা হয় বলে জানায় নিরাপত্তা বাহিনী ও মেডিক্যাল সূত্র।
এদিকে মিসরের সেনাবাহিনী গত শুক্রবার শেষ বেলায় জানায়, মসজিদে জঙ্গি হামলার কয়েক ঘণ্টার মাথায় হত্যাকারীদের ধাওয়া করে বিমান বাহিনী।
যেসব গাড়িতে চড়ে তারা মসজিদে এসে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি গাড়ি যাত্রীসমেত ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া সন্ত্রাসীদের অবস্থান লক্ষ্য করে পরিচালিত বিমান হামলায় অস্ত্র আর গোলাবারুদের মজুদও উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। জঙ্গি হামলায় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, লম্বা চুল-দাড়িওয়ালা ২৫ থেকে ৩০ জন হামলায় অংশ নিয়েছিল।
ছদ্মবেশে আসা হামলাকারীদের হাতে কালো পতাকা ছিল। সব ধরনের এলাকায় চলার উপযোগী পাঁচটি গাড়ি নিয়ে তারা হামলাস্থলে এসেছিল।
মিসরের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বর্বর এই হামলার ঘটনায় প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফাত্তাহ আল সিসি ঘোষিত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক গতকাল থেকে পালন করা হচ্ছে। এক টেলিভিশন বক্তৃতায় তিনি শুক্রবারের হামলার ‘নির্মম জবাব’ দেওয়া হবে বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সেনাবাহিনী ও পুলিশ এ ঘটনার বদলা নেবে এবং দ্রুত তৎপরতায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে। ’
সিনাইয়ে শুক্রবারের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে আপাতত মিসরসংলগ্ন গাজা সীমান্ত খুলে দেওয়া থেকে বিরত থাকছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। গতকাল ওই সীমান্ত খুলে দেওয়ার কথা ছিল। দীর্ঘ এক দশক হামাসের একক নিয়ন্ত্রণে থাকা ফিলিস্তিনের বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড গাজা কার্যত এত দিন অবরুদ্ধ ছিল। ফিলিস্তিনে ক্ষমতাসীন ফাতাহর সঙ্গে চুক্তির পর সীমান্ত উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তী নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত এই সীমান্ত বন্ধ রাখা হবে।
রাজধানী কায়রোর আল-আজহারের প্রধান ইমাম শেখ আহমেদ আল-তায়েব এ হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘আমি সবচেয়ে কঠোর ভাষায় বর্বর এই সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানাই। ’
নিন্দা এসেছে বিশ্বনেতাদের পক্ষ থেকেও। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিনাইয়ের হামলা ‘নিষ্পাপ ও অরক্ষিত প্রার্থনাকারীদের ওপর বীভৎস আর কাপুরুষোচিত সন্ত্রাসী হামলা’ বলে মন্তব্য করেছেন।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে জঙ্গি হামলার পর সিনাইয়ের মসজিদে করা এই হামলা সবচেয়ে ভয়াবহ বলে উল্লেখ করছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। মিসরের সরকারপন্থী লোকজন ও সুফিপন্থীদের লক্ষ্য করে ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিভিন্ন সময় হামলা চালিয়ে এলেও শুক্রবারের এই হামলার দায় তারা এখনো স্বীকার করেনি।
২০১৩ সালের জুলাইয়ে সেনাবাহিনী মুসলিম ব্রাদারহুড নেতা মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে মিসরে জঙ্গি হামলার মাত্রা বেড়ে গেছে। একের পর এক জঙ্গি হামলায় শত শত পুলিশ, সেনা সদস্য ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হচ্ছে। এসব ঘটনার অনেকগুলোর জন্যই আইএসসংশ্লিষ্ট সিনাই প্রভিন্স জঙ্গিগোষ্ঠীকে দায়ী করা হয়। সূত্র : বিবিসি, এএফপি, আলজাজিরা, ফক্স নিউজ