সন্ত্রাসের বিষবাষ্প থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি। রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে ৩ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের সমাপনীতে দেয়া বক্তৃতায় দুনিয়ার দেশে দেশে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানান তিনি। বলেন, গত এক দশকে যেসব সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ হয়েছে, তার কারণ কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। তারা কী চায় সেটিও বোঝা যায় না! নিরীহ মানুষ প্রিয়জনের কাছে যাচ্ছেন, মাঝপথে হাইজ্যাক করে লিভিং বোম্ব হয়ে যাচ্ছে। মানববোমায় কত মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। এই হিংস্রতায় মানুষ কিভাবে বাঁচবে? ভারতের প্রথম বাঙালি প্রেসিডেন্ট বলেন, আজ পরিবেশ দূষণের চেয়েও বড় দূষণ হচ্ছে মানুষের চিন্তায়, ভাবনায়, মনে, কাজে।
সেই দূষণ জাতিসংঘ দূর করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক সম্মেলন থেকে সেটি হবে না। এটি করতে পারবেন সৃষ্টিশীল মানুষ, শিল্পী-সাহিত্যিক ও লেখকরা। তারাই নতুন পৃথিবী তৈরি করতে পারবেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে সমাপনী অনুষ্ঠানে সম্মেলনের আহ্বায়ক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক সামসুজ্জামান খান ও সম্মেলনে পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বক্তব্য রাখেন। কবিতা পাঠ করেন কবি কামাল চৌধুরী। প্রধান অতিথির ১৯ মিনিটের বক্তৃতায় উপমহাদেশের প্রবীণ ওই রাজনীতিক অশান্ত বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সৃজনশীল লেখকদের আরো বেশি আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইতিহাস সৃষ্টি করেন সংবেদনশীল লেখক, সাহিত্যিক, শিল্পীরা। তারাই নব যুগের স্রষ্টা। রাজা-মহারাজারা নয়। অন্যদের পরীক্ষায় পাস করার জন্য মুখস্থ করতে হয়, পরীক্ষা হয়ে গেলে ভুলে যায়। কিন্তু শিল্পীর ছবি, একজনের লেখা, তার কবিতা-উপন্যাস কখনো ভোলা যায় না। পাঠক হিসেবে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছেন উল্লেখ করে প্রণব মুখার্জি বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে সম্মেলনে গৃহীত ও আলোচিত বিষয়গুলোকে চয়ন করে দেখলাম, ঢাকা সংকল্প তৈরি হয়েছে। সঠিকভাবে বর্তমান বিশ্বের মূল্যায়ন হয়েছে সেখানে। শিল্পী, সাহিত্যিক, লেখক তারা অঙ্গীকার করেছেন- পৃথিবীর এই চেহারা পরিবর্তন করতে হবে, যে পৃথিবীতে মানুষ হিংস্রতার শিকার হচ্ছে কোনো কারণ ছাড়া। একুশে ফেব্রুয়ারিকে সারাক্ষণ স্মরণ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, ‘বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মর্যাদা পেয়েছে। আজকের বাংলা, তৎকালীন পূর্ব বাংলা দীর্ঘ ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মাতৃভাষার অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করেছে। তাদের উদ্দেশে সালাম ও প্রণাম। আনুষ্ঠানিকভাবে শুধু ২১শে ফেব্রুয়ারি নয়, প্রতি মুহূর্তে এটি মনে রাখতে হবে। যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের কাছে আমরা দায়বদ্ধ। আমাদের এই ঐতিহ্য, হাজার বছরের ভাষাকে তারা রক্ষা করেছেন। লুট হয়ে যেতে দেননি। আগ্রাসকদের হাতে ধ্বংস হয়ে যেতে দেননি। সম্মেলনের আয়োজক এবং সহায়তাকারী বাংলাদেশের সরকার, বাংলা একাডেমি, নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন এবং ফেন্ডস অব ইন্ডিয়া সোসাইটির প্রতি ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলা সাহিত্য কেবল বাঙালি চিন্তা, তার ধ্যান-ধারণার প্রতিফলন নয়, এটি সর্বজনীনতার প্রতিফলন। সে কারণেই এই মঞ্চ থেকে এই সংকল্প নেয়া সম্ভব, এই বিষাক্ত পৃথিবীকে রক্ষা করবো। আজকে এর প্রয়োজন আছে। অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক তার বক্তব্যে বলেন, ‘প্রণব মুখার্জির উপস্থিতির কারণে এই সম্মেলন একটি ঐতিহাসিক সম্মেলনে পরিণত হলো।’ এ সময় তিনি ভারতে বাংলাদেশি টেলিভিশন চ্যানেল সমপ্রচারের অনুমতি দেয়ার উদ্যোগ নিতে ভারতীয় এই বন্ধুকে আহ্বান জানান। উল্লেখ্য, গত রোববার ঢাকায় আসেন বাংলাদেশের পরম বন্ধু প্রণব মুখার্জি এবং গতকাল মধ্যাহ্নে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সন্ধ্যায় তার সম্মানে দেয়া অর্থমন্ত্রীর নৈশভোজে অংশ নেন। আজ সকালে তিনি চট্টগ্রাম যাবেন। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন এলাকা, ইউরোপিয়ান ক্লাব এলাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করবেন তিনি। চবি বিশেষ সমাবর্তনের মাধ্যমে তাকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার (ডি.লিট) ডিগ্রিতে ভূষিত করবে। কাল তিনি ঢাকায় ফিরবেন। এ দিন সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের সঙ্গে দেখা করবেন। তার সম্মানে বঙ্গভবনে নৈশভোজের আয়োজন করবেন প্রেসিডেন্ট। সফর শেষে বৃহস্পতিবার সকালে নতুন দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন তিনি।
বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান- প্রণব: এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশের চমকপ্রদ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করে প্রণব মুখার্জি বলেন, বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান। গতকাল দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি একথা বলেন। বৈঠকের পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। প্রেস সচিব জানান, প্রণব মুখার্জি বলেছেন, ‘আমি জীবনের দীর্ঘ সময় রাজনীতি করেছি। ভারতের সংসদে এবং রাষ্ট্রপতির পদের মতো সাংবিধানিক পদে ছিলাম। অবসর গ্রহণের পরে আমার অফুরন্ত সময় পড়ার জন্য।’ তিনি ২০১৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশে তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের কথাও স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরে বলেন, তাঁর সরকারের বিভিন্ন বাস্তবধর্মী পদক্ষেপের ফলে দারিদ্র্যের হার ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। গত বছরের বন্যার ফলে দেশের অর্থনীতি খানিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যু সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ মানবিক কারণে প্রায় ১০ লাখ বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিককে আশ্রয় প্রদান করেছে। প্রণব মুখার্জির মেয়ে শর্মিষ্ঠা মুখার্জি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব সুরাইয়া বেগম এ সময় উপস্থিত ছিলেন। পরে ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আয়োজিত মধ্যাহ্ন ভোজে অংশগ্রহণ করেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনের প্রধান প্রবেশ মুখে ফুলের তোড়া হাতে প্রণব মুখার্জিকে স্বাগত জানান। এর আগে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাদুঘর পরিদর্শন করেন তিনি। সেখানে বঙ্গবন্ধুকে সর্বকালের সাহসী নেতা উল্লেখ করে তিনি স্যালুট জানান। পরে পরিদর্শন বইতে তিনি লিখেন, ‘ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে পুনরায় ভ্রমণ করার সুযোগ পেয়ে আমি গর্বিত। স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষকে এই বাড়ি থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন শেখ মুজিব। যাকে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে এখানেই ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ভোরে হত্যা করা হয়। এই বাড়িটিই একটি নতুন জাতির জন্ম ও এগিয়ে চলার ইতিহাসের সাক্ষী। আমি সর্বকালের সাহসী এই নেতাকে স্যালুট জানাই এবং সব শহীদের প্রতি সম্মানজনক শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।