‘তোমাকে মিনতি করি কখনো তুমি বাঙলাদেশের কথা তুলে কষ্ট দিয়ো না।
জানতে চেয়ো না তুমি নষ্টভ্রষ্ট ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইলের কথা; তাঁর রাজনীতি,
অর্থনীতি, ধর্ম, পাপ, মিথ্যাচার, পালে পালে মনুষ্যমণ্ডলি, জীবনযাপন, হত্যা, ধর্ষণ,
মধ্যযুগের দিকে অন্ধের মতোন যাত্রা সম্পর্কে প্রশ্ন ক’রে আমাকে পীড়ন কোরো না;
আমি তা মুহূর্তও সহ্য করতে পারি না, -তাঁর অনেক কারণ রয়েছে।‘
বাংলাদেশের প্রথাবিরোধী লেখক, কবি ড. হুমায়ুন আজাদের লেখা কবিতা এটি। আজ তার জন্মদিন। ১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল (১৪ বৈশাখ, ১৩৫৪ বঙ্গাব্দ), মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে রাঢ়িখালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। যদিও হুমায়ুন আজাদের জন্ম তাঁর নানাবাড়ি কামারগাঁও কিন্তু রাঢ়িখালকে হুমায়ুন আজাদ মনে করতেন তাঁর জন্মগ্রাম।
ব্যক্তিগত জীবন
তিনি ছিলেন একজন বাংলাদেশী কবি, ঔপন্যাসিক, সমালোচক, ভাষাবিজ্ঞানী, কিশোর সাহিত্যিক কলাম লেখক, কলাম প্রাবন্ধিক এবং ঔপন্যাসিকও ।
হুমায়ুন আজাদের আসল নাম ‘হুমায়ুন কবীর’। লেখার জন্য নাম বদল করে শপথপত্রের মাধ্যমে তা স্থায়ী করে নেন। তাঁর অন্যতম প্রণোদনা ছিল প্রথা-বিরোধিতা। কবিতা, উপন্যাস ও রচনা সর্বত্রই তিনি প্রথাবিরোধী ও সমালোচনামুখর। জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর মননশীল এই বহুমাত্রিক লেখকের ৭০টিরও বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রথাবিরোধী লেখক হিসাবে তার সুনাম আছে।
১৯৭৩ সালে ‘অলৌকিক ইস্টিমার’ নামে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ১৯৮০-র দশকের শেষভাগ থেকে হুমায়ুন আজাদ সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য রাখতে শুরু করেন। সামরিক শাসনের বিরোধিতা দিয়ে তার রাজনৈতিক লেখালিখির সূত্রপাত। ১৯৯২ সালে তিনি লেখেন বহুল আলোচিত গ্রন্থ ‘নারী’। বইটি তৎকালীন সরকার নিষিদ্ধ করে মৌলবাদীদের চাপে পড়ে।
ভাষাবিজ্ঞানী হুমায়ুন আজাদ
হুমায়ুন আজাদ যখন ৬০-এর দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ছিলেন, তখন ভাষাবিজ্ঞানে চম্স্কি-উদ্ভাবিত সৃষ্টিশীল রূপান্তরমূলক ব্যাকরণ তত্ত্বটি আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। আজাদই প্রথম এই তত্ত্বের কাঠামোর উপর ভিত্তি করে বাংলা ভাষার গবেষণার একটি অবহেলিত ক্ষেত্র বাক্যতত্ত্ব নিয়ে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাকর্ম সম্পাদন করেন ও বাংলা ভাষার গবেষণাকে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে উত্তরণ ঘটান। আজাদের পিএইচডি অভিসন্দর্ভের নাম ছিল Pronominalization in Bengali (অর্থাৎ বাংলা সর্বনামীয়করণ)। পরবর্তীতে এটি একই শিরোনামের ইংরেজি বই আকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয়। এর পর ১৯৮৪ সালে আজাদ বাংলা বাক্যতত্ত্বের উপর বাক্যতত্ত্ব নামে একটি বাংলা বই প্রকাশ করেন। একই সালে তিনি বাঙলা ভাষা শিরোনামে দুই খণ্ডের একটি সঙ্কলন প্রকাশ করেন, যেটিতে বাংলা ভাষার বিভিন্ন ক্ষেত্রের উপর বিগত শতাধিক বছরের বিভিন্ন ভাষাবিদ ও সাহিত্যিকের লেখা গুরুত্বপূর্ণ ভাষাতাত্ত্বিক রচনা স্থান পায়। এই তিনটি গ্রন্থই ছিল তৎকালীন বাংলা ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাসে অভূতপূর্ব ঘটনা। পরবর্তীতে আজাদ তুলনামূলক-ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান ও অর্থবিজ্ঞানের উপর দুইটি সংক্ষিপ্ত প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক লেখেন। ৯০-এর দশকের শেষের দিকে আজাদ বাংলা ভাষার একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ রচনার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং এই ব্যাপারে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্যাপক পরিকল্পনাও যে তিনি করছিলেন, তাঁর বিভিন্ন উক্তিতে তার প্রমাণ মেলে। তবে দুর্ভাগ্যবশত তিনি তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি।
মৃত্যু
১৯৯৪ সালে তিনি ঔপন্যাসিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন প্রথম উপন্যাস ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল-এর মধ্যে দিয়ে। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় সব কিছু ভেঙ্গে পড়ে। আর এই বইয়ের জন্য তিনি বাংলা একাডেমীর পুরস্কার পেয়েছেন। ২০০২ সালে ১০০০০ এবং আরও একটি ধর্ষণ, ২০০৩ সালে একটি খুনের স্বপ্ন এবং ২০০৪ সালে প্রকাশিত পাক সার জমিন সাদ বাদ। তাঁর অন্য অনেক গ্রন্থের মতো এটিও সমালোচিত হয়। মৌলবাদীরা তাঁর উপর ক্রুদ্ধ হয়। রাজপথ থেকে একসময় ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে সংসদে। মৌলবাদীরা প্রকাশ্যে তাঁকে হত্যার হুমকি দেয়।
হুমকিতেই থেমে থাকেনি সেই অশুভ শক্তি। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দের ২৭ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজের বাসায় যাওয়ার পথে ঘাতকদের আক্রমণের শিকার হন তিনি। ঘাতকরা তাকে নির্মমভাবে এলোপাথারি কুপিয়ে জখম করে। বিদেশে নিবিড় চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি কিছুটা সুস্থ হন। এর কিছুদিন পরেই জার্মান সরকার তাকে গবেষণা বৃত্তি প্রদান করে।
২০০৪-এর ৭ আগস্ট জার্মান কবি হাইনরিখ হাইনের ওপর গবেষণা বৃত্তি নিয়ে জার্মানি যান। ২০০৪ সালের ১২ আগস্ট জার্মানির মিউনিখ শহরে নিজ ফ্ল্যাটের কক্ষে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। জার্মানি যাওয়ার মাত্র পাঁচ দিন পর তার এই মৃত্যু রহস্যময় প্রতীয়মান হয়েছে। ড. হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর পর জার্মান সরকারের তত্ত্বাবধানে মিউনিখে তার এপার্টমেন্টে পাওয়া সব জিনিসপত্র ঢাকায় তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। ওই জিনিসপত্রের ভেতরেই পাওয়া যায় তার হাতের লেখা তিনটি চিঠি। চিঠি তিনটি আলাদা তিনটি পোস্ট কার্ডে লিখেছেন বড় মেয়ে মৌলিকে, ছোট মেয়ে স্মিতাকে এবং একমাত্র ছেলে অনন্য আজাদকে। অনুমান করা হয়, ওই লেখার অক্ষরগুলোই ছিল তার জীবনের শেষ লেখা।তাঁর মরদেহ কফিনে করে জার্মানি থেকে ঢাকায় আনা হয় এবং জন্মস্থান রাড়িখালে ইসলামি পদ্ধতি অনুসরণপূর্বক দাফন করা হয়।
কবিতা
অলৌকিক ইস্টিমার (১৯৭৩)
জ্বলো চিতাবাঘ (১৯৮০)
সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে (১৯৮৫)
যতোই গভীরে যাই মধু যতোই উপরে যাই নীল (১৯৮৭)
আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে (১৯৯০)
হুমায়ুন আজাদের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৯৩)
আধুনিক বাংলা কবিতা (১৯৯৪)
কাফনে মোড়া অশ্রু বিন্দু (১৯৯৮)
কাব্য সংগ্রহ (১৯৯৮)
পেরোনোর কিছু নেই (২০০৪)
উপন্যাস
ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল (১৯৯৪)
সব কিছু ভেঙে পড়ে (১৯৯৫)
মানুষ হিশেবে আমার অপরাধসমূহ (১৯৯৬)
যাদুকরের মৃত্যু (১৯৯৬)
শুভব্রত, তার সম্পর্কিত সুসমাচার (১৯৯৭)
রাজনীতিবিদগণ (১৯৯৮)
কবি অথবা দন্ডিত অপুরুষ (১৯৯৯)
নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের মধু (২০০০)
ফালি ফালি ক’রে কাটা চাঁদ (২০০১)
শ্রাবণের বৃষ্টিতে রক্তজবা (২০০২)
১০,০০০, এবং আরো একটি ধর্ষণ (২০০৩)
একটি খুনের স্বপ্ন (২০০৪)
পাক সার জমিন সাদ বাদ (২০০৪)
প্রবন্ধ
শিল্পকলার বিমানবিকীকরণ ও অন্যান্য প্রবন্ধ (১৯৮৮)
ভাষা-আন্দোলন: সাহিত্যিক পটভূমি (১৯৯০)
নারী (১৯৯২)
প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে (১৯৯২)
নিবিড় নীলিমা (১৯৯২)
মাতাল তরণী (১৯৯২)
নরকে অনন্ত ঋতু (১৯৯২)
জলপাই রঙের অন্ধকার (১৯৯২)
রবীন্দ্র প্রবন্ধ/রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তা (১৯৯৩)
শামসুর রাহমান/নিঃসঙ্গ শেরপা (১৯৯৩)
সীমাবদ্ধতার সূত্র (১৯৯৩)
আধার ও আধেয় (১৯৯৩)
আমার অবিশ্বাস (১৯৯৭)
পার্বত্য চট্টগ্রাম : সবুজ পাহাড়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হিংসার ঝরনাধারা (১৯৯৭)
মহাবিশ্ব (২০০০)
দ্বিতীয় লিঙ্গ (মূল : সিমোন দ্য বোভোয়ার) (২০০১)
আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম (২০০৩)
ধর্মানভূতির উপকথা ও অন্যান্য (২০০৪)
ভাষাবিজ্ঞান
Pronominalization in Bengali (১৯৮৩)
বাঙলা ভাষার শত্রুমিত্র (১৯৮৩)
বাক্যতত্ত্ব (১৯৮৪)
বাঙলা ভাষা (প্রথম খন্ড) (১৯৮৪)
বাঙলা ভাষা (দ্বিতীয় খন্ড) (১৯৮৫)
তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান (১৯৮৮)
অর্থবিজ্ঞান (১৯৯৯)
কিশোরসাহিত্য
লাল নীল দীপাবলি বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী (১৯৭৬)
ফুলের গন্ধে ঘুম আসেনা (১৯৮৫)
কতো নদী সরোবর বা বাঙলা ভাষার জীবনী (১৯৮৭)
আব্বুকে মনে পড়ে (১৯৮৯)
বুকপকেটে জোনাকিপোকা (১৯৯৩)
আমাদের শহরে একদল দেবদূত (১৯৯৬)
অন্ধকারে গন্ধরাজ (২০০৩)
Our Beautiful Bangladesh (২০০৪)
অন্যান্য
হুমায়ুন আজাদের প্রবচনগুচ্ছ (১৯৯২)
সাক্ষাৎকার (১৯৯৪)
আততায়ীদের সঙ্গে কথোপকথন (১৯৯৫)
বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময় (১৯৯৭)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রধান কবিতা (১৯৯৭)