আমার শিক্ষক বাবা

0

আরিফ চৌধুরী:

‘আমি কার বংশধর সঠিক জানি না
কালান্তরে পিতা ও প্রপিতা
ছেড়ে গেছে নিজস্ব নিবাস
আমি যাবো সেই পথে
পশ্চাতে জ্বলতে উওরাধিকার’।
(গৃহমুখী, শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ের প্রতি- মুহম্মদ নূরুল হুদা)

আমার বাবা ছিলেন পিতৃভুমির মতো আপন, পিতৃভুমি যতটা কাছের আমার কাছে, ঠিক ততটা পিতা ও হুদয়ের কাছের, আর্দশের। পিতামহের আর্দশের পথ ধরে সারাটা জীবন আমৃত্যু আদর্শকে আয়নার মতো সামনে ধরে বেঁচেছেন তিনি। কারো মুখাপেক্ষি হতে হয়নি কখনো তাকে। পিতামহের ছিলো গৃহস্থ জমি, গোয়াল ভরা গরু, ছিলো প্রতিপওি আর যথেষ্ট উদ্দাম ছিলো আপন সন্তানদের জন্য। নিজ বাড়িতে সুখে থাকার জন্য সব আয়োজন করেছিলেন তিনি অনায়াসেই। পাঁচটি পুত্র সন্তানরা নিয়ে পিতামহের উৎকন্ঠার ও শেষ ছিলোনা। তাই পিতামহ চিন্তা করতেন সভ্যতাকে আপন করে কাছে টানতে না চাইলেও ইচ্ছে ছিলো সন্তানরা অন্তত: স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠুক। পিতামহ চিন্তা করতেন প্রতিপওিতে তিনি সাÍা জীবন তিনি টিকে থাকতে পারবেন না সেই উৎকন্ঠা থাকলেও ভরসা ছিলো অধিক। তাই সন্তানদের কাউকে করতে চাইলেন গৃহস্থ, কাউকে ডাক্তার, কাউকে শিক্ষক, কাউকে অন্য পেশার মানুষ। তিনি মনে মনে এই ভাবনা পোষন করতেন কৃষিজীবি ছাড়াও সন্তানরা শহরমুখী জীবনে অভ্যস্থ হয়ে উঠুক। সন্তানদের সব সময় লেখাপড়ার জন্য তাগাদা দিতেন।

পিতামহ ধণী ছিলেন না, ছিলেন মাণ্যবর, কিছুটা ধ্যানী ও ধার্মীক। দূর সর্ম্পকের অনেকের সন্তানরা শহরের আবহাওয়ায় বড় হচ্ছে তেমন সংবাদ তিনি সর্বদাই পেতেন। তাইতো পিতামহের ইচ্ছায় দ্বিতীয় সন্তানকে লেখাপড়া শেষ করে শহরে চলে আসতে হয়। কারন তিনি জানতেন তার উদ্দেশ্য সংসারের সমূহ পতন ঠেকানো। পিতামহ ভাবতেন প্াঁচ সšন্তানকে কৃষিজমি ভাগ করে দিলেও কেউ স্বনির্ভর হয়ে নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করতে পারবেন না । ভূমি ও র্কৃষি জমির পরিমান এমন নয় যে যা দিয়ে তিনি নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করতে পারবেন এবং সন্তানরা লেখাপড়া করে বড় হলেই তার দুশ্চিন্তা কেটে যাবে এমন ভাবনা ভাবতেন মনে মন্।ে তাইতো আমার পিতা মৌলভী মো: খোরশেদ আলম চৌধুরী’র শিক্ষা জীবন শুরু হয়েছিলো গ্রামের আল পথ ধরে পাঠশালায় ছুটে যাবার মধ্য দিয়ে, কখনো নগ্ন পায়ে ছুটে গেছেন গ্রামের স্কুল বা মক্তব্ ে। বাড়িতে কুপি বাতি জ্বালিয়ে পাঠ্যাভাস গড়ে উঠেছিলো প্রতিদিন।

আমার বাবা ১৯০৯ সালের মিরসরাই থানার নির্ভৃত পল্লীর এক আদর্শ গ্র্াম মিঠানালার মিয়া বাড়িতে জন্মগ্রহন করেছিলেন। খুব অল্পবয়সে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৩০ সালের ১৯ নভেম্বরে কলকাতা মাদ্রাসা বোর্ডের অধিনে (ফাজিল) ডিগ্রি লাভ করেন। পিতামহের ইচ্ছে ছিলো উওরাধিকার সুত্রে পাওয়া মসজিদে সেবায় মনোনিবেশ করবে সন্তানটি। কিন্তুু পিতা নিজের গ্রামের স্কুলে (মিঠানালা রামদয়াল হাই স্কুল) যোগদান করলেন ইংরেজীর শিক্ষক হিসেবে। সেই থেকে শুরু করলেন শিক্ষকতা জীবন। যৎসামান্য শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে চাইলেন দূর থেকে দূরান্তে। অন্যদিকে, শিক্ষিত ছেলের পড়াশোনার মূল্য বুঝতে বেগ পেতে হয়নি পিতামহকে কারন, তিনি ছিলেন বিচক্ষণ, আগামী দিনের সম্ভাবনায় সন্তানরা যে অভিজ্ঞতায় পল্লবিত হয়ে শহরে ছুটে যাবেন সেটা বুঝতে পিতামহের বেগ পেতে হয়নি একটুও। তাই সন্তানদের শিক্ষাকে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন তিনি এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মতো শিক্ষা যে মানুষকে অনেকদূরে নিয়ে যেতে পারে তা বুঝতে সময় লাগেনি।

শিক্ষকতার পেশাতে জড়াতে না জড়াতেই তিনি ১৯৪০ সালে বিয়ে করেন মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া’র খৈয়াছরা গ্রামের এক সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে। সেই পরিবারের একমাত্র পুত্র সন্তানের সাথে একসাথে পড়াশোনার সুবাদে বন্ধুত্ব গড়ে উঠায় একমাত্র কন্যা সন্তান নূরজাহান বেগমকে বিয়ে করে সংসারের সচ্ছলতা ঘুচাতে পরিবারের উচ্চাশাকে সামাল দিতে গিয়ে নিত্য দুশ্চিন্তার শেষ ছিলোনা। তাই স্কুলের শিক্ষকতায় সংসারের দিনযাপনে স্বচ্ছল ও স্বাধীন জীবন লাভ করা কষ্ঠসাধ্য হয়ে পড়ে। শহরমখী শিক্ষকতার পেশাকে ছড়িয়ে দিতে তিনি ৫০ দশকে চট্রগ্রাম শহরতলীর স্বনামধন্য স্কুল ‘কাট্রলী নুরুল হক চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ে’ যোগদান করেন। নতুন চাকুরির পাশাপাশি এক সম্ভান্ত পরিবারের সন্তানদের স্কুল ছুটির পর পড়াশোনার অগ্রগতি লক্ষ্য করার দায়িত্ব নিলেন।

অন্যদিকে, শহরমুখি হলেও গ্রামের গন্ধ মুছে যায়নি তার শরীর থেকে। কারন, গ্রামতো খুব দূরের পথ নয়্, ট্রেনবা বাস থেকে নেমে গ্রমের মেঠো পথ ধরে পায়ে বা রিকসা করে অল্প সময়ে বাড়িতে পোঁছানো যায়। গ্রামের জীবনযাপন থেকে দূরে সরে গেলেও নানা কারনে সুযোগ পেলে গ্রামে ছুটি যেতেন। গ্রামের মানুষও ছুটে আসতেন শহরের খবর নিতে। তবুও দূরত্ব কমতোনা কিছুতেই। দূরত্ব বাড়তে থাকতো নিয়মিত।
১৯৫০-১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জীবনের এই দীর্ঘ পথ একভাবেই জীবনযাপন করেছেন তিনি। পরিবর্তন হয়নি কিছুই না জীবনযাত্রায়, না সময়ের নিয়ন্ত্রনে। নিজস্ব গতিতে পাড়ি দিয়েছেন তিনযুগের অধিক সময়কাল। যে কোন ধরনের রাজনীতি থেকে নিজেকে সবসময় সরিয়ে রাখতেন। মনুষের শিক্ষায় আছেন, থাকবেন এমন ভাবনা কাজ করতো সবসময় এবং নিজের সংসারের ভারসাম্য রক্ষায় সর্বদা ছিলেন তটস্ত ও চিস্তিত। এমনি করে সংসারটা একটু একটু করে বড় হতে লাগলো। জটিল হতে লাগলো জীবনযাপন, সংসারের টানাপোড়েন বেড়ে গেলো মধ্যবিও সংসারের পতন ঠেকানোর আশায়।

তাই, অনেক সময় আর্থিক সংকটে একটু আধটু মুছড়ে যেতেন। নিজের বিবেকের সাথে যুদ্ব করতেন হামেশাই, আড়ালে কাউকে বুঝতে দিতেননা। সীমিত আয়,সীিিমত চাহিদার মানুষ ছিলেন বলেই উচচাশ্ াছিলোনা কখনো। টাকা-পয়সা জমিয়ে জমি-জিরাত করো এমন চিন্তা থেকে নিজেকে সবসময় দুরে রাখতে চেষ্টা করেছেন, কারণ তিনি জানতেন এমন লিপ্সা মানুষকে পরিণত করে অন্য মানুষে। স্থির ছিলেন আপন বিশ্বাসের প্রতি, ছিলেন অটল জীবনযাপনে। শত কষ্টের মাঝেও গ্রামে ফিরে যাবার চিন্তা করেননি।গ্রামে ফিরে যাবেনবাই কেন? এই এলাকার মানুষের ভালোবাসাইতো হুদয় সিক্ত ছিলো প্রস্ফুটিত ফুলের মতো। কারণ তিনি আলো ছড়িয়েছেন পাহাড়ের কোল থেকে সমুদ্রের কুল জুড়ে।

অন্যদিকে,চাকুরি জীবনে প্রায় বিশটি বছরের অধিককাল কেটে গেছে কিন্তুু ঘর-বাড়ি করছেননা, চারদিকের মানুষ তরতর করে উপড়ে উঠার সিঁড়ি খুঁজছেন যেখানে সেখানে তিনি আপোষহীন বেড়ে উঠেছেন আঁকড়ে ধরে নিজের খুঁটি। তিনি কেন পথভ্রষ্ঠ হবেন , এমন ধারনাই আঘাত করতো প্রতিনিয়ত তাকে। তিনি গন্তব্য হারাতে পারেনন্,া সাথে মনুষত্বও। তাই শিক্ষকতাকে পঁিুজ করে চলে গেছেন নিজের চিওে,সাহসী চেতনায়। ভেবেছেন সর্বদা শিক্ষাই মূল্যবোধ গড়ে তুলবে নিজের সন্তানদের। পরাধীনতার গøানি সন্তানদের মাঝে ছড়িয়ে না পড়ে সে চিন্তা করেছেন সবসময় ভেবেছেন আশায় বসতি করে যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু নিয়ে বাঁচা যেনো ভদ্রলোকের বাঁচা।

তাইতো, তিনি মরচে ধরা ঘরে থেকেছেন ,জানালায় পলেস্তরা ধরা পশ্চিমের বাতাসে নি:শ্বাস নিয়েছেন ,চাকচিক্য নেই, জৌলুস নেই এমন স্দাাসিদে শুভ্র কাপড়ে জীবনযাপন করেছেন অনায়াসেই, তবুও থেকেছেন সুখে,শান্তিতে,আদর্শে নীতিও প্রজ্ঞাকে ধারণ করে। সন্তানরা শিক্ষায় আলোর মুখ দেখবে, আলোকিত হবে ধর্মবিশ্বাসে সেভাবে বাঁচার আকুলতার গল্প শোনাতেন সবসময়। আত্বসন্মানে আঘাত লাগে এমন কাজও করতে পছন্দ করতেন না । নিজের নি:স্বতায়,যন্ত্রনায় কম্পিত হয়েছেন নিভৃতে তবুও ভাবনায় গড়ে তুলেছেন আত্বসন্মানের দেয়াল।

প্রান্তিক বয়সে এসে সন্তানদের সাহচর্যে থেকেছেন। তবুও অসুস্থতায় কখনো হতাশায় ডুবে গেলেও উঁচিয়ে ধরেছেন আর্দশের পতাকা। দিন দিন অসুস্থতার ম্ত্রাা বেড়ে গেলেও সন্তানদের জন্য শংকা কমেনি কিছুতেই। একটু একটু করে ক্লান্ত হয়েছেন পরিণত বয়সে, বিশ্রাম চেয়েছেন মনে মনে তবুও চিকিৎস্যা করতে চাননি রোগশয্যায়। মনে মনে স্থির ছিলেন বাসা থেকে কোথাও যাবেন না। কিন্তুু শেষকটা দিন হাসপাতালের বেডে শুয়ে আকুলতা দেখিয়েছেন ঘরে ফিরে আশার। ফিরে এসেছেন নিজ ঘরে, কিন্তুু সুস্থ হতে পারেননি সম্পুন্নভাবে। প্রকৃতির সান্নিধ্য থেকে মানুষ যে প্রকৃত মানুষ হতে পারে, স্বকীয় পরিচয়ে জীবনদর্শন গড়ে তুলতে পারে তা তিনি নি:শব্দ মায়ায় বুঝিয়ে দিয়েছেন সর্বদাই।

১৯৭৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর এক শীতার্ত রাতে নাট্যকার বেগম মমতাজ হোসেনের ধারাবাহিক নাটক ‘শুকতারা’র একটি পর্ব চলছিলো বিটিভিতে,বাসার টিভিটা নষ্ট ছিলো বলে পাশের বাসায় আমরা দ’ুভাই নাঠক দেখতে গিয়েছিলাম, হঠাৎ করে পিতার অসুস্থতার সংবাদে ছুটে এলাম বাসায়। বাসার পরিস্থিতি দেখে বুঝতে একটুও বাকী রইলোনা সংসারের শুকতারাটি এক নিমিষে খসে পড়েছে। খসে গেলেও তিনি দু’চোখের আলো দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন আর্দশের ,সত্যের,ভালোবাসার,যাত্রাপথ শেষ হয়না কখনো। তিনি তৈরী করে দিয়ে গেলেন মানুষ গড়ার সত্যের সাঁকো।

তিনি থাকবেন আমৃত্যু কারন তার প্রতিপওি ছিলো ভিন্ন চিন্তায়, তার ছোঁয়ায় অগনিত সন্তানরা আলোকিত হয়ে উঠবে, আর্দশকে ধারণ করে গড়ে তুলবে নতুন পথ,সেটাই ছিলো আজন্ম স্বপ্ন। কারণ তিনি ছিলেন মহীরুহের মতো বিশাল প্রতিভায় প্রজ্জ্বলিত। সকল প্রতিকুলতাকে ছাড়িয়ে তিনি মানুষ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে তিনি পোঁছে গিয়েছিলেন সকলের মনের দরজায়। দ্বীপ না জ্বালালে যেমন অলো জ্বলেনা, ধূপ না জ্বালালে যেমন গন্ধ ছড়ায়না, তেমনি তিনি নি:শব্দ আলো জ্বালিয়ে দিয়েছেন সবার চেতনায়। যে আলো দেখা যায়না, ছড়িয়ে যায় দূর থেকে দিগন্তে। যেনো নিত্য তার আসা যাওয়া। কারণ তিনি নি:শব্দ পথের আলোকিত বাতিঘর।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.