রাশিচক্র সম্পর্কে ইসলামের বিধান

0

জীবনের সর্বক্ষেত্রেই আল্লাহ্‌র নির্দেশ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ অনুসরণ করে চলার মধ্যেই দুনিয়া ও আখেরাতের শান্তি ও কল্যাণ নিহিত। এ ছাড়া আর সকল মতের ও সকল পথের অনুসরণের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে অমঙ্গল ও অশান্তির বীজ। জাদুকর্ম, দৈবকর্ম ও জ্যেতিষকর্ম চর্চা করা – যার মাধ্যমে মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জানতে পারার দাবি করা হয় এবং বিপদাপদ ও রোগ ব্যাধি দূর করা যায় বলে ধারণা করা হয় – এ সবই ইসলামী শরী‘আতে সুস্পষ্ট ভাবে হারাম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের বিরোধী। অথচ এসব কাজ চর্চার মাধ্যমে এক-শ্রেণির মানুষ জনসাধারণকে রোগের চিকিৎসা, বিপদাপদ দূর করা ও আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারিত করছে। ফলে সংশ্লিষ্ট লোকজনের ঈমান, আমল ও আকীদা যেমন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়ছে, তেমনি এসব কর্ম-চর্চাকারীরা মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও প্রতারণার জাল বিস্তার করে সমাজকে অসুস্থ করে তুলছে। জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চা শুধু হারামই নয় একজন জ্যোতিষবিদের কাছে যাওয়া এবং তার ভবিষ্যদ্বাণী শোনা, জ্যোতিষশাস্ত্রের উপর বই কেনা অথাব একজনের কোষ্ঠী যাচাই নিষেধ। যেহেতু জ্যোতিষশাস্ত্র প্রধানত ভবিষ্যদ্বাণী করার জন্য ব্যবহৃত হয়, যারা এই বিদ্যা চর্চা করে তাদের জ্যোতিষী বা গণক বলে গণ্য করা হয়।
ফলস্বরূপ, যে তার রাশিচক্র খোঁজে সে রাসূল (সা) প্রদত্ত বিবৃতির রায়ের অধীনে পড়েঃ

ইমাম মুসলিম তাঁর সহিহ গ্রন্থে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: من أتى عرافا فسأله عن شيء لم تقبل له صلاة أربعين ليلة
অর্থ : ‘‘যে ব্যক্তি কোন দৈবজ্ঞের কাছে এসে কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করে, চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার নামায কবুল হবে না’’।

এমনকি জ্যোতিষের বক্তব্যের সত্যতায় সন্দিহান হওয়া সত্ত্বেও একজনের শুধু তার কাছে যাওয়া এবং প্রশ্ন করার শাস্তি এই হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। যদি কেউ জ্যোতিষ-সংক্রান্ত তথ্যাদির সত্য মিথ্যায় সন্দিহান হয়,তবে সে আল্লাহর পাশাপাশি অন্যরাও হয়তো অদৃশ্য এবং ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে জানে বলে সন্দেহ পোষণ করে। এটা এক ধরনের শিরক।
কারণ আল্লাহ স্পষ্ট করে বলেছেনঃ  “অদৃশ্যের কুঞ্জি তাঁহারই নিকট রহিয়াছে, তিনি ব্যতীত কেহ জানে না।” [সূরা আন-আনআমঃ ৫৯]
“বল আল্লাহ ব্যতীত আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীতে কেহই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না।” [সুরা আন-নামল: ৬৫]

যতই জ্যোতিষ বলুক অথবা যা কিছুই জ্যোতিষশাস্ত্রের বইয়ে থাকুক, কেউ তার রাশিচক্রে প্রদত্ত ভবিষ্যদ্বাণী বিশ্বাস করলে সে সরাসরি কুফরি (অবিশ্বাস) করে। কারণ রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ”যে একজন ভবিষ্যতদ্রষ্টা গণকের নিকট গেল এবং সে যা বলে তা বিশ্বাস করল, মুহাম্মদের নিকট যা অবতীর্ণ হয়েছিল সে তা অবিশ্বাস করল।” [Sunan Abu Dawood vol.3, p.1095, no.3895]

পূর্বে বর্ণিত হাদিসের মত এই হাদিসে শাব্দিকভাবে গণকের সম্বন্ধে উল্লেখ করা হলেও জ্যোতিষবিদদের জন্যেও সমভাবে প্রযোজ্য। উভয়ই ভবিষ্যতের জ্ঞানের অধিকারী বলে দাবি করে। জ্যোতিষবিদদের দাবি সাধারণ গণকদের তৌহিদের বিরোধিতা করার মত। সে দাবি করে যে মানুষের ব্যক্তিত্ব নক্ষত্র দ্বারা নিরূপিত এবং তাদের ভবিষ্যৎ কর্মকান্ড এবং তাদের জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী নক্ষত্রে লিপিবদ্ধ রয়েছে। সাধারণ গণক দাবি করে যে একটি কাপের তলায় চায়ের পাতায় গঠন অথবাহাতের তালুর রেখা একই বিষয় বলে। উভয় ক্ষেত্রে তারা সৃষ্ট বস্তর বাস্তব বিন্যাসের মধ্যে অদৃশ্যের জ্ঞানের ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা দাবি করে।

জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস এবং রাশিচক্র পরীক্ষা করা পরিস্কারভাবে ইসলামের শিক্ষা এবং বিশ্বাসের বিপক্ষে। সেটাই সত্যিকারের শূন্য ও নিঃস্ব আত্মা যা খাঁটি ঈমানের (বিশ্বাসের) স্বাদ গ্রহণ করেনি এবং এই সব পথ খুঁজে বেড়ায়। অপরিহার্যভাবে,এই সব রাস্তা পূর্বনির্ধারিত নিয়ত হতে মুক্তি পাবার একটি নিষ্ফল প্রচেষ্টার প্রতীক। অজ্ঞ লোকেরা মনে করে যে তারা যদি জানে আগামীকাল তাদের ভাগ্যে কি রয়েছে, তারা আজ থেকে তার জন্য প্রস্তুতি নিতে পারে। ঐভাবে তারা অমঙ্গল এড়াতে সক্ষম হতে পারে এবং মঙ্গল নিশ্চিত করতে পারে।
তথাপি, আল্লাহ কর্তৃক আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কে বলা হয়েছেঃ “বল, আল্লাহ যাহা ইচ্ছা করেন তাহা ব্যতীত আমার নিজের ভাল মন্দের উপরও আমার কোন অধিকার নেই। আমি যদি অদৃশ্যের খবর জানিতাম তবে তো আমি প্রভূত কল্যাণই লাভ করিতাম এবং কোন অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করিত না। আমিতো শুধু মু’মিন সম্প্রদায়ের জন্য সর্তককারী ও সুসংবাদবাহী।” [সুরা আল-আ’রাফঃ ১৮৮]

সুতরাং, সত্যিকার মুসলমানগণ এই সব ক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে থাকতে নৈতিকভাবে বাধ্য। একইভাবে আংটি, গলার হার ইত্যাদির উপর যদি রাশিচক্রের চিহৃ থাকে তবে তা পরা উচিত নয়, এমনকি কেউ তাতে বিশ্বাস না করলেও। এটি একটি বানোয়াট পদ্ধতির অংশ যা কুফর বিস্তার করে এবং একে সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করা উচিত। কোন বিশ্বাসী মুসলমানের রাশিচক্র কি তা জিজ্ঞাসা করা অথবা তার প্রতীক অনমান করার চেষ্ট করাও উচিত নয়। কোন পুরুষ অথবা মহিলা কর্তৃক খবরের কাগজের রাশিচক্রের কলাম পড়া অথবা পড়তে শোনাও অনুচিত। যে মুসলমান তার কার্যক্রম নির্ধারণ করতে জ্যোতিষতত্ত্ব সম্বন্ধীয় পূর্বাভাস ব্যবহার করে, তার উচিত আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থণা (তওবা) করা এবং ইসলামের উপর বিশ্বাস নবায়ণ করা।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “من أتى كاهنا فصدقه بما يقول فقد كفر بما أنزل علي محمد صلى الله عليه وسلم”
অর্থ : ‘‘যে ব্যক্তি কোন গণকের কাছে আসে এবং সে যা বলে তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, সে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অবতীর্ণ সত্যের প্রতি কুফুরী করল।’’
এ হাদিসটি আবু দাউদ ও সুনানের চারটি গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। আর হাকেম হাদিসটিকে সহিহ বলে অন্য শব্দে বর্ণনা করেছেন: “من أتى عرافا أو كاهنا فصدقه فيما يقول فقد كفر بما أنزل على محمد صلى الله عليه و سلم”
অর্থ : ‘‘যে ব্যক্তি কোন দৈবজ্ঞ বা গণকের কাছে আসে এবং তার বক্তব্যকে সত্য বলে মেনে নেয়, সে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অবতীর্ণ সত্যকে অস্বীকার করল।’’
ইমরান ইবনে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:  “ليس منا من تطير أو تطير له، أو تكهن أو تكهن له، أو سحر أو سحر له ومن أتى كاهنا فصدقه بما يقول فقد كفر بما أنزل على محمد”
অর্থ : ‘‘যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট কিছুর ভিত্তিতে কোন কিছু অশুভ বলে ঘোষণা দেয় কিংবা যার জন্য [তার চাওয়া অনুসারে] অশুভ বলে ঘোষণা দেয়া হয়; যে ব্যক্তি গণনা করে কিংবা যার জন্য [তার চাওয়া অনুসারে] গণনা করা হয়; যে ব্যক্তি জাদু করে কিংবা যার জন্য [তার চাওয়া অনুসারে] জাদু করা হয়— তাদের কেউই আমাদের অন্তর্গত নয়। আর যে ব্যক্তি কোন গণকের কাছে এসে তার বক্তব্যকে সত্য মনে করে, সে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অবতীর্ণ সত্যকে অস্বীকার করল’’। হাদিসটি বায্‌যার উত্তম সনদে বর্ণনা করেছেন।

উপরে বর্ণিত হাদিসসমূহে দৈব জ্ঞানের দাবিদার, গণক, জাদুকর ও তদনুরূপ লোকদের কাছে আসতে এবং তাদেরকে কোন কিছু জিজ্ঞেস করতে ও তাদের বক্তব্য সত্য বলে বিশ্বাস করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং এ ব্যাপারে ভয় প্রদর্শন ও করা হয়েছে। সুতরাং শাসকবর্গ ও মানুষকে সৎ কাজের আদেশদানের এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ— যাদের হাতে ক্ষমতা ও শক্তি রয়েছে, তাদের প্রত্যেকেরই উচিত গণক, দৈব জ্ঞানের দাবিদার ও অনুরূপ পেশাজীবীদের কাছে আসতে লোকদের নিষেধ করা, হাটে-বাজারে ও অন্যত্র যে কোন ধরনের দৈবজ্ঞান আদান প্রদান নিষিদ্ধ করা, দৈবজ্ঞ ও তাদের কাছে যারা আসে সবার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।

তাদের কথা কোন কোন ব্যাপারে সত্য বলে প্রমাণিত হওয়ার ফলে এবং এক শ্রেণির লোক তাদের কাছে বেশি আনাগোনা করার ফলে তাদের দ্বারা কারো প্রতারিত হওয়া ঠিক নয়। কারণ ঐ শ্রেণির লোকেরা মূলত মূর্খ। তাই তাদের দ্বারা প্রতারিত হওয়া অনুচিত। কেননা এতে গুরুতর পাপ, মহাবিপদ ও খারাপ পরিণতি থাকায় এবং যারা এসব কাজে লিপ্ত তারা মিথ্যাবাদী ও দুষ্ট প্রকৃতির লোক হওয়ায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে আসতে, প্রশ্ন করতে এবং তাদেরকে সত্যবাদী হিসাবে প্রতিপন্ন করতে নিষেধ করেছেন।

আল্লাহ্‌ আমাদের সবাইকে শিরক এবং কুফর থেকে বেচে থাকের তউফিক দান করুক। আমিন।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.