একুশে ফেব্রয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

0

সাইফুল হোসেন,
ইউরোপিয়ানরা যখন পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকা দখল করে শাসন ও শোষনের আগ্রাসন চালিয়েছিল ঠিক তখন অনেক জাতি নিজ ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস সব ভূলে গিয়ে পরিণত হয়েছিল দাসত্বে। যারা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রæয়ারি মাতৃভাষা ও বাংলার মর্যাদা অখুন্ন রাখতে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে মায়ের বুক শূন্য করে শহীদ হয়েছেন সেই ভাষা সৈনিক রফিক, সালাম, বরকত, সফিউর, জব্বার। যাদের রক্তে মুক্ত হয়েছিল স্বাধীন দুঃখিনী বর্ণমালা মায়ের ভাষা। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় রাস্তা পারি দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের মধ্য দিয়ে তা চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে। তাই একুশে ফেব্রæয়ারি বাঙালির কাছে চির প্রেরণার প্রতিক। একুশের প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রীয় ভাবে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বুকে শোকের প্রতিক কালো ব্যাজ ধারন করে শহীদ মিনারে সকলেই জানান শ্রদ্ধা নিবেদন। মাতৃভাষা আন্দোলনের ৬৬ বছর পূর্ণ হলো আজ। ভাষা শহীদদের রক্তের বিনিময়ে বাঙালী জাতি সেদিন মায়ের ভাষার মর্যাদা অর্জনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও পায় নতুন প্রেরণা। আমরা সেই গর্বিত জাতি যারা ভাষার জন্য, মাতৃভূমির জন্য, সংস্কৃতির জন্য জীবন দিতে শিখেছি। কেউ কেড়ে নিতে পারেনি আমাদের স্বাধীনতা। এ দেশের সূর্য সন্তানেরা যদি সেদিন ভাষার জন্য জীবন না দিতেন তাহলে হয়তো আমরা আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলতাম। ২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওনের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আহমাদ তেজন কাববাহ ঐ রাষ্ট্রে উপস্থিত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীর ৫ হাজার ৩ শত বাংলাদেশী সৈনিকদের সেবার স্বীকৃতি স্বরুপ বাংলা ভাষাকে সরকারী ভাষার মর্যাদা প্রদান করেন। এটি বাংদেশের প্রধান ভাষা। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ শে ফেব্রæয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষনা করে। রাজধানীর ঢাকায় ১৯৪৭ সালের নভেম্বর, ডিসেম্বরে ভাষা বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের ২১ শে মার্চ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ঢাকায় এক ভাষনে ঘোষনা করেন উর্দূই হবে পাকিস্তানের একমাত্র ” রাষ্ট্রভাষা ”। জিন্নাহর এই বিরুপ মন্তব্যে তাৎক্ষনিকভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে উপস্থিত ছাত্র জনতার একাংশ। এরপর থেকেই আন্দোলন জোরদার হতে থাকে, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রæয়ারি যার চরম প্রকাশ ঘটে। এইদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে বেরিয়ে এলে পুলিশ তাদের উপর গুলি চালায়। এতে ছয়জন ছাত্র যুবক হতাহত হন। ২২ ফেব্রæয়ারি ছাত্রদের পাশাপাশি সাধারন মানুষ প্রতিবাদ জানাতে পুনরায় রাজপথে নেমে আসে। এদিন নবাবপুর রনখোলা ও ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকায় পুলিশ মিছিলে গুলি বর্ষণ করে। সরকারী হিসেব মোতাবেক এদিন চারজন শহীদ হন। ২১ শে ফেব্রæয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্বীকৃতি পাওয়ার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সাধনা। কানাডা প্রবাসী বাঙালী রফিকুল ইসলাম ও আব্দুস সালামের প্রতিষ্ঠিত ” দি মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভার অফ দি ওয়ার্ল্ড ” সংগঠন ১৯৮৮ সালের ২৯ শে মার্চ জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে ২১ শে ফেব্রæয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষনার প্রস্তাব করে চিঠি পাঠান। বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীর অনুমতিক্রমে প্রস্তাবটি ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে পেশ করেন। ইউনেস্কোর ২৮ টি সদস্য রাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রস্তাব লিখিতভাবে সমর্থন করেন। ২১ শে ফেব্রæয়ারি এখন গোটা বিশ্বের মাতৃভাষা দিবস। রক্তের আলপনা এঁকে যারা এই ভাষাকে রাজকীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তারাই আমাদের রতœ তারাই মাতৃভাষার প্রতিষ্ঠাতা ও বীরমুক্তিযোদ্ধা। এইদিনে তাদের জানাই সশস্ত্র সালাম ও শ্রদ্ধা।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.