
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ভাষা বিজ্ঞানী ড. হুমায়ুন আজাদ হত্যার ১৫ বছর গেলেও শেষ হয়নি এর বিচার কাজ।
২০০৪-এ প্রকাশিত হয় হুমায়ুন আজাদের পাক সার জমিন সাদ বাদ গ্রন্থ। এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হলে দেশের মৌলবাদী গোষ্ঠি তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়, এবং বিভিন্ন স্থানে হুমায়ুন আজাদের বিরুদ্ধে প্রচারনা চালায়। তিনি এই বইটিতে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীকে ফ্যাসিবাদী সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এর কঠোর সমালোচনা করেন। আর তারই জের ধরে ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত বইমেলা থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজের বাসায় যাওয়ার পথে ঘাতকদের আক্রমণের শিকার হন তিনি।
‘হত্যা চেষ্টা’ হিসেবে প্রথমে মামলাটি দায়ের করা হলেও পরবর্তীতে তা হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে চার্জশিট দেয়া হয়। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার চতুর্থ মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন।
হত্যা মামলায় ৪১ জন সাক্ষীর সাক্ষগ্রহণ শেষে আগামী ২১ মার্চ আসামিদের ‘এক্সামিন’ এর জন্য দিন ধার্য রেখেছেন আদালত। তবে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় ১০জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ২১ মার্চ দিন ধার্য করেন আদালত।
এ বিষয়ে মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মাহফুজুর রহমান চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মামলাটির বিচার কাজ শেষ পর্যায়ে। তবে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের বিষয়টি কবে নাগাদ শেষ হবে তা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।’
উল্লেখ্য, ২০০৪ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সামনে বহুমাত্রিক লেখক ড. হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা।
পরে দেশে ও থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নেন তিনি। ওই বছরের ৮ আগস্ট যান জার্মানির মিউনিখে। সেখানে ১১ আগস্ট মারা যান এই ভাষাবিজ্ঞানী।
এদিকে ওই ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর রমনা থানায় ড. হুমায়ুন আজাদের ছোটভাই মঞ্জুর কবির বাদী হয়ে একটি হত্যা চেষ্টার মামলা করেন। যা পরে হত্যা মামলায় রূপ নেয়। পরে ২০০৭ সালে ১৪ নভেম্বর দণ্ডবিধি ও বিস্ফোরক আইনে এ মামলায় পৃথক দুটি অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়।
এর মধ্যে হত্যা মামলায় পাঁচজন ও বিস্ফোরক আইনে তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক কাজী আবদুল মালেক। পরে এ মামলায় ২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।
পরে সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে হুমায়ুন আজাদের ভাই ও মামলার বাদী মঞ্জুর কবির মামলার বর্ধিত তদন্তের আবেদন করেন। আদালত ওই বছরের ২০ অক্টোবর মামলাটি তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন।
বিভিন্ন সময় মামলার তদন্ত করেন রমনা থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক মাহবুবুর রহমান, সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক কাজী আব্দুল মালেক, মোস্তাফিজুর রহমান ও লুৎফর রহমান।
২০১২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর জেএমবির পাঁচ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আনুষ্ঠানিক বিচার কাজ শুরু করেন তৎকালীন ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. হাবিবুর রহমান।
আসামি মিজানুর রহমান ও আনোয়ারুল আলম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তারা বলেন, ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ বইটি লেখার কারণে ড. হুমায়ুন আজাদের ওপর এ হামলা চালানো হয়। যার পরিকল্পনা করেন সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই।
মামলার অপর আসামিরা হচ্ছেন- হাফিজ মাহমুদ, সালেহীন ও নুর মোহাম্মদ ওরফে সাবু। এর মধ্যে সাবু ছাড়া বাকি আসামিরা কারাগারে। আর বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ধারায় মিজানুর রহমান, আনোয়ারুল আলম ও নুর মোহাম্মদ ওরফে সাবুকে আসামি করা হয়েছে।
অন্য একটি মামলায় জঙ্গিনেতা শায়ক আব্দুর রহমান, আতাউর রহমান সানি, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, খালেদ সাইফুল্লাহর মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর হওয়ায় মামলার অভিযোগপত্র থেকে তাদের নাম বাদ দেয়া হয়।
এছাড়া মামলার চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় জামায়াতের নায়েবে আমির দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীসহ আরও পাঁচজনের নাম।
জন্ম ও পারিবার
আজাদ ১৯৪৭ সালে মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে তাঁর নানাবাড়ি কামাড়গাঁওয়ে জন্ম নেন, তাঁর জন্ম নাম ছিলো হুমায়ুন কবীর। ১৯৮৮ সালে ২৮ সেপ্টেম্বর নাম পরিবর্তনের মাধ্যম তিনি বর্তমান নাম ধারণ করেন। বাবা আবদুর রাশেদ প্রথম জীবনে বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও পোস্টমাস্টারির চাকুরি করতেন, পরে ব্যবসায়ী হন।[৪] মা জোবেদা খাতুন একজন গৃহিণী ছিলেন। তিন ভাই এবং দুই বোনের মধ্যে আজাদ ছিলেন পিতামাতার প্রথম পুত্রসন্তান। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর পিতৃবিয়োগ ঘটে। তিনি ছেলেবেলায় প্রায় ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত রাড়িখাল গ্রামে বেড়ে ওঠেন।
শিক্ষা জীবন
১৯৫২ সালে হুমায়ুন ‘রাড়িখাল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে’ প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হন, ওখানে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়েন, এরপর ১৯৫৫ সালে তৃতীয় শ্রেণী বাদ দিয়ে তিনি সরাসরি চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হন রাড়িখালের ‘স্যার জে সি বোস ইন্সটিটিউশন’-এ, যেটাতে তৃতীয় শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছিলো। ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। এ বিদ্যালয় থেকে তৎকালীন ‘ইস্ট পাকিস্তান সেকেন্ডারি এডুকেশন বোর্ড’ এর অধীনে ১৯৬২ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি ১৯৬৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট (উচ্চ মাধ্যমিক) পাশ করেন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি এবং ১৯৬৮ সালে একই বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। উভয় পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন।
১৯৭৬ সালে তিনি স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল বাংলা ভাষায় সর্বনামীয়করণ। এই গবেষণাপত্র পরবর্তীকালে ১৯৮৩ সালে প্রোনমিনালাইজেশান ইন বেঙ্গলি নামে বাংলা একাডেমি থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
তার কবিতা
গদ্যের জন্য বেশি জনপ্রিয় হলেও হুমায়ুন আজাদ আমৃত্যু কাব্যচর্চা করে গেছেন। তিনি ষাটের দশকের কবিদের সমপর্যায়ী আধুনিক কবি। সমসাময়িক কালের পরিব্যাপ্ত হতাশা, দ্রোহ, ঘৃণা, বিবমিষা, প্রেম ইত্যাদি তার কবিসত্বার প্রধান নিয়ামক। প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম অলৌকিক ইস্টিমার যা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ এর জানুয়ারিতে। কাব্যগ্রন্থটি তিনি উৎসর্গ করেন ১৯৬৮-১৯৭২ এর রাত-দিনগুলোর উদ্দেশে।
তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ জ্বলো চিতাবাঘ প্রথম প্রকাশিত হয় ফাল্গুন, ১৯৮০ সালের মার্চ। সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। প্রথম প্রকাশের সময় এপ্রিল ১৯৮৫ সাল। ১৯৮৭ সালের মার্চে প্রকাশিত হয় তাঁর চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘যতোই গভীরে যাই মধু যতোই ওপরে যাই নীল’। তার পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ ’আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে’ (ফেব্রুয়ারি, ১৯৯০)। এর আট বছর পর ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয় তার ষষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু। কাব্যগ্রন্থটি কবি তার ‘প্রিয় মৃতদের জন্য’ উৎসর্গ করেন। সপ্তম কাব্যগ্রন্থ পেরোনোর কিছু নেই (ফেব্রুয়ারি, ২০০৪) মাসে। এটিই হুমায়ুন আজাদের জীবদ্দশায় প্রকাশিত শেষ কাব্যগ্রন্থ।
তবে হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর পর বঙ্গাব্দ ১৪১১ এর ফাল্গুনে (ফেব্রুয়ারি,২০০৫) এই সাতটি কাব্যগ্রন্থ সহ আরো কিছু অগ্রন্থিত ও অনূদিত কবিতা নিয়ে তাঁর কাব্যসমগ্র প্রকাশিত হয়। নব্বুইয়ের দশক থেকে ঢাকার আগামী প্রকাশনী তাঁর গ্রন্থাবলীর প্রধান প্রকাশক।