রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ: মুক্ত জীবনের স্বপ্নচারী কবি

0

আরিফ চৌধুরী: রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দ্রোহ ও প্রেম এই দুই চৈতন্যে বাহিত শব্দকে নিজেই কবিতায় ধারণ করে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব কাব্য সত্ত্বা। আধুনিক বাংলা কবিতা নির্মাণে নিজের সংবেদনশীল কবি সত্ত্বাকে রূপায়ন করেছেন নিজস্ব নির্মাণ কৌশলে। তাইতো তিনি দ্রোহের কবি, চেতনায় জাতি সত্ত্বার কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলাদেশের আধুনিক কাব্য ধারার চেতনাকে ধারণ করে নিজের গ্রামের গ্রামীণ পটভূমিকে কবিতায় বারবার তুলে এসেছেন। কবিতায় ঘুরে ফিরে এসেছে তার স্মৃতি বিজড়িত সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। যাপিত জীবনে তারুণ্যের দুরন্তনা, প্রেম, ভালোবাসা, অবহেলা, স্বদেশ চেতনা ও ভাবনার কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্বল্প সময়ে জীবনকে দেখেছেন অভিনবত্বে, নতুন সৃষ্টির একাগ্রতায়। কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছাড়াও নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন তার কবিতাকে করেছে আত্মপ্রত্যয়ী ও আন্দোলিত। আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে বারবার রাজনৈতিক চেতনা ও জীবনের নানা টানাপোড়েন। মৃত্তিকাস্পর্শী কণ্ঠস্বরের কবি মাটি, মানুষ ও প্রাকৃতজনের শোষণ ও বৈষম্যের চিত্র অংকন করেছেন কবিতায় নিয়ত। নিজস্ব শব্দমালায় নিরীক্ষা প্রবণ কবিতায় মূর্ত হয়েছে পাওয়া না পাওয়ার বেদনাবোধ। তাইতো তিনি জাতিকে জাগিয়ে তোলার শব্দাবলি উচ্চারণ করেছেন এভাবেই-

‘দক্ষিণ সমুদ্রের মতো আজ আমাকে প্লাবন হতে দাও
হতে দাও অপ্রতিরোধ্য বিপুল টাইফুন
এখন আমাকে মুখোমুখি হতে দাও চিহ্নিত শত্র“র
হাতে তুলে নিতে দাও সম্মিলিত মানুষের বিক্ষুব্ধ হৃদয়
আর-তার সঠিক প্রতীক ও আগ্নেয়াস্ত্র
বুলেটের বিরুদ্ধে আমাকে আজ
হাতে তুলে নিতে দাও আগুন ও বারুদ ভাষা’
(আগুন ও বারুদের ভাষা-মৌলিক মুখোশ)

মাটি ও মানুষ ও ঐতিহ্যের প্রতি দায় বোধ তার কাব্যে শোষণ, স্বৈরাচার ও সা¤প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বলিষ্ট উচ্চারণ প্রতিফলিত হয়েছে বারবার। নতুন সৃষ্টির বৈচিত্র্য ও শিল্প নিরীক্ষায়।
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র জন্ম ১৬ই অক্টোবর, ১৯৫৬ সালে বরিশাল জেলার আমানগঞ্জে। পৈত্রিক নিবাস বাগেরহাটের মোংলার সাহেবের মেঠ গ্রামে। শৈশবের নানার বাড়ি মিঠেখালি গ্রামেই তার বেড়ে উঠা। সেই গ্রামের ইসমাইল মেমোরিয়াল স্কুলে পড়াকালীন তার চরিত্রে দুরন্তপনা, কবিতাপাঠ ও আবৃত্তির প্রতি ঝোক প্রকাশ পায়। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নবম শ্রেণীর ছাত্র কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাাহ যুদ্ধের ভয়াবহতা, নৃশংসতা, অমানবিক হত্যাকান্ড, ছাড়াও পাক সেনাদের নির্যাতনের চিত্রাবলি দেখেছেন খুব কাছ থেকেই। ১৯৭৩ সালে ঢাকার ওয়েষ্ট এন্ড হাই স্কুল থেকে এস.এস.সি এবং ঢাকা কলেজ থেকে আই.এস.সি পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮০ সালে বাংলায় øাতক (সম্মান) ডিগ্রি ও ১৯৮৪ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় বরেণ্য চিন্তাবিদ, গবেষক কবি আহমদ ছফার অনুকুল্যেতে। যার প্রকাশক ছিলেন আহমদ ছফা। তরুণ কবিতা কর্মীর সৃষ্টিশীলতাকে বুঝতে বেগ পেতে হয়নি তাকে। তিনি জাতীয় কবিতা পরিষদ ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের অন্যতম উদ্যোক্তা। ১৯৮০ সালে কবি নূরুল হুদা ও কবি কামাল চৌধুরীকে নিয়ে দ্রাবিড় প্রকাশনা সংস্থা গঠিত হলে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ফিরে চাই স্বর্ণ গ্রাম এই প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৮৪ সালের এপ্রিলে তৃতীয় কাব্য ‘মানুষের মানচিত্র’ প্রকাশিত হলে ভিনধর্মী কাব্য ও নিজস্বতার জন্য বিপুলভাবে প্রশংসিত হন কবি। ১৯৮৪ সালে চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ছোবল এবং ১৯৮৭ সালে প ম কাব্য গ্রন্থ ‘গল্প’ প্রকাশিত হয় নিখিল প্রকাশনী থেকে। ৬ষ্ঠ কাব্য ‘দিয়েছিলে সকল আকাশ’ প্রকাশ পায় মুক্তধারা থেকে ১৯৮৮ সালে এবং ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয় ‘মৌলিক মুখোশ’।
মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়েছিলো কাব্য গ্রন্থ ‘এক গস্নাস অন্ধকার’ (১৯৯২) এবং কাব্যনাট্য ‘বিষ বিরিক্ষের বীজ’ (১৯৯২) সালে প্রকাশিত হয়। মৃত্যুর তিন বছরের পরে ১৯৯৪ সালে কবির শেষ জীবনের বন্ধু অগ্রজ কবি অসীম সাহার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ গ্রন্থটি। শ্রেষ্ঠ কবিতা গ্রন্থে কবির বেশ কটি অপ্রকাশিত কবিতাবলি ও প্রকাশিত হয়েছিলো। ১৯৮৯ সালে কবি কবিতার পাশাপাশি গানও রচনা শুরু করেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের শিল্পী তালিকায় গীতিকার হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হন এবং নিজের অনেক গানের সুরারোপ করেন। তার গান ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’ কবিতাটি একটি চলচ্চিত্রে সংযোজিত হলে তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি প্রদত্ত ১৯৯৭ সালের শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসাবে (মরণোত্তর) সম্মাননা লাভ করেন। জীবদ্দশায় কবি ‘ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম’ কাব্য গ্রন্থের জন্য ‘মুনীর চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার’ সহ অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেন।
স্বৈরাচার বিরোধী নব্বইয়ের গণ আন্দোলনের সময় কবির কলম ছিলো প্রতিবাদ মুখর। সে সময়কার সামরিক জান্তা সশস্ত্রবাহিনীকে উদ্দেশ্য করে তার কবিতা জাগিয়ে ছিলো নতুন চেতনায়। তাকে গ্রেফতারের জন্য হন্ন হয়ে খুঁজছিলো পুলিশ। সেই কবিতা যেমন-

দাঁড়াও নিজেকে প্রশ্ন করো-কোন পক্ষে যাবে?
রাইফেল তাক করে আছো মানুষের দিকে।
সঙ্গিন উঁচিয়ে আছে ধূর্ত নেকড়ের মতো।
পায়ে বুট, সুরক্ষিত হেলমেট ঢেকে আছো মাথা।
সশস্ত্র তোমার হাত, সংগঠিত, কে তোমাকে ছোঁয়।
তোমার বুলেট মানুষের বুক লক্ষ্য কোরে ছুটে যাচ্ছে
তোমার বুলেট মানুষের মাথার খুলি উড়িয়ে দিচ্ছে
তোমার বুলেট মানুষের হৃদপিন্ড স্তব্দ কোরে দিচ্ছে
তুমি গুলি ছুঁড়ছো, তুমি গুলি ছুঁড়ছো মানুষের দিকে।
দাঁড়াও নিজেকে প্রশ্নকরো-কোন পক্ষে যাবে?
(সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি-ছোঁবল)

রাজনীতির ছায়া তার কবিতার প্রধান অবলম্বন হলেও তিনি নাগরিক কবি, প্রেম ও মৃত্তিকা সংলগ্নতার কবি। গ্রামীণ মানুষের নিসর্গ জীবনকে তিনি গভীরভাবে ধারণ করেছেন কবিতায়। অন্তর্গত রোমান্টিকতার যন্ত্রণা প্রবলভাবে উপলব্ধি করেছেন জীবনযাপনে ভালোবাসার চরম ব্যর্থতায়, জীবনের দুঃসময়েও তিনি ন্যুজ হননি, কবিতায় ধারণ করেছেন সে সকল বেদনাবোধ। যেমন-

‘তোমাকে ফেরাবে প্রেম, মাঝরাতে চোখের শিশির,
বুকের গহীণ ক্ষত, পোড়া চাঁদ তোমাকে ফেরাবে।
ভালোবাসা ডাক দেবে আশ্বিনের উদাসিন কুসুম।
তোমাকে ফেরাবে স্বপ্ন, পারিজাত, মাটির কুসুম।
তোমাকে ফেরাবে প্রাণ, এই প্রাণ নিষিদ্ধ গন্ধম,
তোমাকে ফেরাবে চোখ, এই চোখ শানিত আগুন,
তোমাকে ফেরাবে হাত, এই হাত নিপুণ নির্মাণে,
তোমাকে ফেরাবে তনু, এই তনু বিকশিত হেম।

কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাাহ আজীবন ছিলেন প্রতিষ্ঠান বিরোধী। মানবিক মূল্যবোধ নির্ভর মুক্ত জীবনের স্বপ্নই তাকে তাড়িত করেছে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। সমাজের সব বৈষম্য অনাচার, সা¤প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, আর অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে আমৃত্যু কলম ছিলো সজাগ। তার কবিতার বৈশিষ্ট্য শব্দের ব্যবহারে অভিনবত্ব, নিজস্বতা, স্বকীয়তা, তাকে বিপুল পাঠকের কাছে করেছে গ্রহণযোগ্য। স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ উচ্চারণের কবি তারুণ্যের প্রতীক কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ লিভারের জঠিল রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৯১ সালের ২১ জুন ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। জীবনের শেষ দিকের এক লেখায় কবি লিখেছিলেন-‘জীবন দিয়ে জানিয়ে গেলাম, জীবন অন্ধকার’।

লেখক: কবি, ও প্রাবন্ধিক
সভাপতি, চট্রগ্রাম কবিতা পরিষদ।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.