সরওয়ার কামাল জামান: শবে বরাত যা হাদীসের ভাষায় লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান বলা হয়। একটি ফযীলতপূর্ণ রাত। এ রাতের ফযীলত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। সালাফ কর্তৃক স্বীকৃত। সালাফের ইমামগণ এ রাতকে গুরুত্ব দিতেন এবং আমলও করতেন।
তবে কালক্রমে এ রাতের মূল ফযীলতের সাথে যুক্ত হয়েছে কিছু মুনকার বা অস্বীকৃত কথা ও আমল; যা পরিত্যাজ্য ও অগ্রহণযোগ্য।
ইসলামের সর্বস্বীকৃত নীতি হলো, শরীয়ত সম্পর্কিত কোনো বিষয়ের সাথে জাহেলদের পক্ষ থেকে মুনকার কোনো বিষয় যুক্ত হলে ঐ মূল বিষয়টি মুনকার হয়ে যায় না; বরং তখন আহলে ইলমদের উপর দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় মুনকার বিষয়সমূহ উম্মতকে জানিয়ে সঠিক বিষয়টির সীমারেখা নির্দিষ্ট করে দেয়া। যেনো একটি শরীয়ত স্বীকৃত বিষয় শরীয়ত বহির্ভূত না হয়ে যায়। কেননা, শরীয়তের যে কোনো বিষয়ে বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি নিন্দিত। বর্তমানে কিছু ভাই নতুন বাড়াবাড়ির শিকার হচ্ছেন। শবে বরাতের মূল ফযীলত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও তারা অস্বীকার করছেন। মূল বিষয়টিকেই অস্বীকার করে প্রচার করছেন, ইসলামে শবে বরাতের কোনো ধারণা নেই। এ ব্যাপারে যত রেওয়ায়েত আছে সব মওযু বা যয়ীফ। এসব হাদীস অনুযায়ী আমল করা এবং শবে বরাতকে বিশেষ কোনো ফযীলতপূর্ণ রাত মনে করা শরীআতের দৃষ্টিতে যায়েয নয়। অথচ তাদেরই মান্যবর অনেক আলেম এ রাতের ফযীলতের কথা স্বীকার করেছেন। এমন কি এ বিষয়ের হাদীসকেও সহীহ বলেছেন।
শবে বরাতের বিষয়ে নতুন করে বিচার বিশ্লেষণের কিছু নেই। যুগে যুগে ইমামগণ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন এবং স্বীকৃতি দিয়েছেন। বক্ষমান প্রবন্ধে তাদের আলোচনা সংক্ষেপে তুলে ধরার প্রয়াস পাবো। পাঠক মনোযোগসহ পড়লে সহজেই বুঝতে সক্ষম হবেন, শবে বরাতের ফযীলত প্রমাণিত কি না? প্রথমে কিছু হাদীস উল্লেখ করে এরপর সালাফের আমল তুলে ধরার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।
#হাদীসের_আলোকে_শবে_বরাত
দিন বা রাতের ফযীলত প্রমাণিত হওয়ার জন্য একটি হাদীসই যথেষ্ট। অথচ শবে বরাতের ফযীলত একাধিক হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত। যেমন-
(১) হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
يَطْلُعُ اللَّهُ إِلَى خَلْقِهِ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَيَغْفِرُلِجَمِيعِ خَلْقِهِ إِلالِمُشْرِكٍ أَوْمُشَاحِنٍ
“অর্ধ শাবানের রাতে আল্লাহ তায়ালা আপন সৃষ্টির প্রতি বিশেষভাবে মনোনিবেশ করেন। অতঃপর মুশরিক ও (মুসলিম ভাইয়ের সাথে) শত্রুতা পোষণকারী ছাড়া সমস্ত মাখলুককে ক্ষমা করে দেন।” সহীহ ইবনে হিব্বান- ১২/৪৮১ (৫৬৬৪)
হাদীসের মান:
হাদীসটি ‘সহীহ’র মানে উত্তীর্ণ হওয়ার কারণে ইমাম ইবনে হিব্বান রহ. তার কিতাব ‘সহীহ ইবনে হিব্বানে’ বর্ণনা করেছেন। ইমাম যুরকানী রহ. বলেন,
فإن ابن حبان قد صححه وكفى به اعتمادا
‘‘ইবনে হিব্বান রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
হাদীসটির উপর ইতিমাদ করার জন্য এটাই যথেষ্ট।’’
আরো বলেন, فإن حديث معاذ هذا حسن
শারহুল মাওয়াহিব (৫৬১/১০)
ইমাম ইবনে হিব্বান রহ. ছাড়া আরো অনেক হাদীস বিশারদ হাদীসটিকে ‘নির্ভরযোগ্য’ বলেছেন। যেমন- হাইছামি রহ. বলেন, وَرِجَالُهُمَا ثِقَاتٌ.
“হাদীসের সকল রাবী ছিকাহ অর্থাৎ নির্ভরযোগ্য।” (মাজমাওয যাওয়ায়েদ ৮/৬)
ইমাম বায়হাকী রহ. এ হাদীসটির গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে বলেন.
وقد روينا هذا من أوجه،وفي ذالك دلالة على أن للحديث أصلا من حديث مكحول.
(শুআবুল ঈমান-৩/৩৮৬)
লা-মাযহাবী ও সালাফীদের মান্যবর আলেম আলবানী মারহুমও হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন ,
حديث صحيح روى عن جماعة من الصحابة من طرق مختلفة يشد بعضها بعضا .
তিনি এই হাদীসের সমর্থনে আরো আটটি হাদীস উল্লেখ করার পর লেখেন,
جملة القول أن الحديث بمجموع هذه الطرق صحيح بلاريب.
‘‘সারকথা সমষ্টিগতভাবে হাদীসটি সন্দেহাতীত ‘‘সহীহ’’ প্রমাণিত হয়।” (সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহা, ১১৪৪)।
শায়েখ শোআইব আল আরনাউত রহ. শাওয়াহিদের মাধ্যমে হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন। সহীহ ইবনে হিব্বানের টীকায় বলেন,
صحيح بشوا هد
এতোগুলো ইমাম ও আলেম হাদীসটিকে সহীহ বলার পর আর অস্বীকারের কোনো সুযোগ থাকে না। অথচ কেউ কেউ ঠুনকো অজুহাতে এ হাদীসটিকে দুর্বল আখ্যা দিতে চায়। মূলত এটি তাদের নীতিগত দুর্বলতা। এ হাদীসের সকল বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য এবং সূত্র অবিচ্ছিন্ন। কেননা মাকহুল এবং মালেক বিন ইউখামির একই যুগের মানুষ। তাদের মাঝে সাক্ষাত হয়েছে এবং হাদীস বর্ণনা হয়েছে এটিই স্বাভাবিক। এর বিপরীত কোনো প্রমাণ নেই। এ ক্ষেত্রে সনদ মুত্তাসিল ও অবিচ্ছিন্ন হওয়ার ব্যাপারে সকল মুহাদ্দিসগণের ঐকমত্য রয়েছে।
ইমাম মুসলিম রহ. বলেন,
أن القول الشائع المتفق عليه بين أهل العلم باالأخبار والروايات قديما و حديثا أن كل رجل ثقة ,روى عن مثله حديثا ,وجائز ممكن له لقاؤه والسماع منه ,لكونهما جميعا كانا في عصر واحد, وإن لم يأت في خبر قط أنهما اجتمعا ,ولا تشافها بكلام,فالرواية ثابتة والخحة بها لازمة ৃ
মুকাদ্দামায়ে মুসলিম(১/২৯।
২) হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. থেকে বর্ণিত,
قال رسو ل الله صلي الله عليه وسلم اذا كان ليلة النصف من شعبان ينزل الله تبارك و تعالي الي سما ءالدنيا فيغفر لعباده إلا ما كان من مشرك او مشا حن لأخيه .
‘‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: অর্ধ শাবানের রাতে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। অতঃপর মুশরিক ও (মুসলিম ভাইয়ের সাথে) শত্রুতা পোষণকারী ছাড়া সকল বান্দাদের কে ক্ষমা করে দেন।’’ ( আত তাওহিদ ইবনে খুযায়মা (১/৩২৫), মুসনাদে বাযযার ১/২০৬)।
হাদিসের মান: বাযযার রহ. হাদীসটি বর্ণনা করার পর বলেন, فجلالة ابي بكر تحسنه.
আবু বকর রাযি. এর ব্যক্তিত্বের কারণে হাদীসটি হাসান পর্যাযের। আরো বলেন ,
وقدرو ىهذا الحديث أهل العلم ونقل وهو احتملوه …
‘‘আহলে ইলমগণ হাদীসটিকে বর্ণনা করেছেন এবং গ্রহণ করেছেন।’’ (মুসনাদে বাযযার ১/২০৬)।
ইমাম মুনযিরী রহ. বলেন,
ورواه البزار والبيهقي من حديث أبي بكر الصديق رضي الله عنه بنحوه بإسناد لا بأس به
‘‘আবু বকর রাযি. এর সূত্রে বর্ণিত হাদীসটি ইমাম বাযযার এবং বায়হাকী বর্র্ণনা করেছেন যে, সনদটিতে কোনো সমস্যা নেই।’’(আত তারগীব ওয়াত তারহীব (৪১৯০)।
“সালাফি মান্যবর আলেম মাওলানা আবদুর রহমান মুবারকপুরী রহ. ইমাম মুনযিরী রহ. এর বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন।” (তুহফাতুল আহওয়াযী- ৬/৪৬৬)।
৩) ইমাম শাফেয়ী রহ. থেকে বর্ণিত,
وبلغنا انه كان يقال ان الدعاء يستجاب في خمس ليال في ليلة الجمعة وليلة الاضحي وليلة الفطر واول ليلة من رجب وليلة النصف من شعبان ثم قال وانا استحب كل ما حكيت في هذ الليا لي من غير ان يكون فرضا .
“আমাদের কাছে এ বর্ণনা পৌঁছেছে যে, বলা হতো, পাচঁ রাতে দুআ কবুল হয়। এক. জুমুআর রাতে। দুই. ঈদুল আযহার রাতে। তিন. ঈদুল ফিতরের রাতে। চার. রজবের প্রথম রাতে। পাঁচ. মধ্য শাবানের রাতে। …(ইমাম শাফিঈ রহ. বলেন,) আর আমি যেসব রাতের কথা বর্ণনা করলাম, তাতে দুআ করা মুস্তাহাব বলি, ফরজ নয়।” (আল-উম্ম- ১/২৬৪)।
প্রিয় পাঠক নিজেই বিচার করুন। উপর্যুক্ত হাদীসগুলো দ্বারা শবে বরাতের ফযীলত প্রমাণিত হয় কি না? এ সকল হাদীস বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও এ ফযীলতকে সমূলে অস্বীকার করা যায় কি না? সর্বোপরি যারা ইনসাফের সাথে বিষয়টি বিবেচনা করবে তারা কখনোই অস্বীকার করতে পারবে না। তাই লা-মাযহাবী ও সালাফী অনেক আলেমও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। নিম্নে সালাফের যুগে এ রাতের কিছু আমল তুলে ধরা হলো।