ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী হারিয়ে যাচ্ছে বিখ্যাত জমিদার -মুন্সীবাড়ি

0

শফিউল ইসলাম শাফি, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : অবহেলিত উত্তর বঙ্গের পশ্চাদপদ, মঙ্গাপীড়িত কুড়িগ্রাম জেলার অধীনস্থ এক অতি প্রাচীন জনপদের নাম উলিপুর। আজকের বিংশ শতাব্দীর দ্বার প্রান্তে দাঁড়িয়ে বিশ্ব সভ্যতার সাথে তাল মিলিয়ে আমরা উলিপুরবাসী আজ যতটুকু অগ্রসর ও অগ্রগামী হইয়াছি তার মূলে রহিয়াছে কাসিম বাজার এস্টেটের সপ্তম জমিদারের স্ত্রী মহারাণী স্বর্ণময়ী। সেই প্রগতি ও ক্রমবিকাশের কথা বলতে গেলে যাদের অবদান সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য তাদের মধ্যে কাসিম বাজার এস্টেটের সপ্তম জমিদার ছিলেন কৃষ্ণনাথ নন্দী ও তাহার স্ত্রী মহিয়সী মহারাণী স্বর্ণময়ীর নাম এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বিরাজ করছে আমাদের অন্তরে। বিশেষ করে শিক্ষা, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণমূলক ক্রমবিকাশে ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করিলে তাঁর অবদান উলিপুরের পরিসীমা ছাড়িয়ে দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বের ইতিহাসে স্থান পাবার দাবী রাখে।

ইতিহাস থেকে জানা যায় ,কাসিম বাজার এস্টেটের সপ্তম জমিদার ছিলেন কৃষ্ণনাথ নন্দী। তিনি এক খুনের মামলায় আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর বিষয়কে নিজের জন্য অবমাননাকর ও আতœমর্যাদাহীন মনে করেন। ১৮৪৪ সালের ৩১ অক্টোবর নিজ বাসভবনে আত্মহত্যা করেন। এরপর তাহার স্ত্রী মহারানী স্বর্ণময়ী কাসিমবাজার এস্টেটের জমিদার হন। মহারাণী স্বর্ণময়ী এই পশ্চাৎপদ জনপদের অশিক্ষিত মানুষগুলোকে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার জন্য ১৮৬৮ সালে তিনি উলিপুরে ‘উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়’ নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। যাহা উলিপুর মহারাণী স্বর্ণময়ী বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয় নামে সবার সুপরিচিত। বর্তমানে উহা উলিপুর মহারাণী স্বর্ণময়ী স্কুল এন্ড কলেজ নামে খ্যাত।স্বর্ণময়ী ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী প্রজাদরদি জমিদার।তার অধীনে মুনসেফের চাকরি করতেন বিনোদী লাল। বিনোদী লাল বার্ষিক একশত টাকায় ধরণীবাড়ী এস্টেটের জোতদারি ভোগ করতেন। বর্তমান কালের সাক্ষী হয়ে যে অট্টালিকাটি দাঁড়িয়ে আছে সেটি তৈরি করেন বিনোদী লালের পালক পুত্র শ্রী ব্রজেন্দ্রলাল মুন্সী আঠারো শতকে ব্রজেন্দ্রলাল মুন্সী ১৯৬০ সালে মারা যান। তার কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। তবে তার স্ত্রী আশলতা মুন্সীর বিহারীলাল নামে একজন পালকপুত্র ছিল। বিহারী লাল ছিলেন ভবঘুরে, মাতাল এবং নির্লোভ ব্যক্তি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাইফুল হক যিনি তৎকালীন কোন একটি এনজিও অফিসে চাকরি সূত্রে এখানে থাকতেন। ULIPUR-TOP Features- PHOTOএলাকার কয়েকজন বয়স্ক মানুষের কাছ থেকে জানা যায়, তিনি বিহারী লাল থেকে বাড়িটি লিখে নেন। সাইফুল পক্ষের দাবি তারা বাড়িটি কিনে নিয়েছেন। সরেজমিনে জানা যায়, ব্রজেন্দ্রলাল মুন্সী বিহারী লালকে পালকপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেননি, গ্রহণ করেছিলেন আশালতা। তাছাড়া ব্রজেন্দ্রলাল মুন্সী তার সমস্থ সম্পত্তি স্ত্রীকে দেননি। তার স্ত্রী শুধু প্রশাসনের বিশেষ অনুমতি নিয়ে সম্পতির অংশ থেকে দান-খয়রাত, পূজা-অর্চনা ও বিভিন্ন উন্নয়নে ব্যয় করতে পারবেন, এভাবে উইল করে দিয়েছিলেন ব্রজেন্দ্রলাল মুন্সী। যেখানে সম্পত্তি বিক্রি করা আশালতার অধিকার ছিল না । সেখানে তার পালক পুত্র পাওয়ার প্রশ্নেই ওঠে না। এরপর থেকে সরকার ও সাইফুল পক্ষের মধ্যে মামলা চলছে। মামলাটি আজও বিচারাধীন।

বর্তমানে বাড়িটির একটি কক্ষে ভূমি অফিস, আর একটিতে আছে অনেক পুরনো ভূমি-সংক্রান্ত মোটা মোটা খাতার ফাইল পত্র। বাকি কক্ষগুলো পরিত্যক্ত পড়ে আছে। সংস্কারের অভাবে একটু বৃষ্টি হলেই পানিতে ভিজে যায় কক্ষের ভেতরের অংশ। যার ফলে নষ্ট হয়ে গেছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফাইল। ছাদের পানি পড়ার জন্য যে বাঘের মুখ ছিল একসময়, তা আজ প্রতক্ষদর্শীদের বর্ণনায় পাওয়া যায়। কারু-কার্যখচিত দেয়াল আজ সংস্কারের অভাবে চাঁপা পড়ছে শেওলার নিচে। ভেতরে জঙ্গলে ভরা। যাতে শোভা পায় বড় বড় গেছো শামুক।

অবহেলা-অযত্নে স্বার্থপরতায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী বিখ্যাত মুন্সীবাড়ি। এলাকাবাসীর দাবি, মামলাটি দ্রুত নিস্পতি করে সংস্কার করে ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে সংরক্ষণ করে একে দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে তোলা।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.