সৈয়দ শামছুল হুদা
জেনারেল সেক্রেটারী
বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট (বিআইএম) …..
বনি ইসরাইলের ব্যাপারে আমাদের কাছে একটি বিষয় খুব প্রসিদ্ধ আছে যে, ওরা খুব বেশি প্রশ্ন করতো। আর এই অতিরিক্ত প্রশ্নের কারণে তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সকল বিধান সহজভাবে অবতীর্ণ হতো, তা জটিল আকার ধারণ করতো। আজ বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এ কথাটা বলা যায় যে, আমরাও বনি ইসলাইলের এই আদর্শ আলোচনা করতে করতে খুব ভালোভাবে সেটা আমাদের মধ্যেই ফিট করে নিয়েছি। সব ব্যাপারে প্রশ্ন। কেউ বুঝে করে। কেউ না বুঝেই করে। দেশের বড় বড় আলেমদের কোন সিদ্ধান্তই এদেশের তরুন প্রজন্মের আলেমদের কাছে একবাক্যে স্বীকৃত হবে না। যত ভালো সিদ্ধান্তই আসুক, সেটা নিয়ে কোন না কোন পক্ষ এমনভাবে প্রশ্ন তুলবে, যে কারণে বড়রা বাধ্য হয়ে উঠে সিদ্ধা্ন্ত পরিবর্তন করতে।
বাংলাদেশে সবার কাছেই গ্রহনযোগ্য এমন কোন আলেম এখন আর বর্তমান নেই। কাউকেই আমরা বিতর্কিত না করে ছাড়ি নাই। আমাদের মধ্যে একটা বহুল প্রচলিত শব্দ হলো, তিনি কোন ঘরানার? ঘরানার না মিললে তাকে উঠতে দেওয়া হবে না। তার কোন ভালো কথাকেও বিতর্ক ছাড়া ছেড়ে দেওয়া হবে না। কেউ যদি বিপরীতমুখি মত প্রকাশ করে, তাহলে প্রথমে তাকে কোন ছাঁচে ফেলে দিবো। যেমন তাকে কি জামায়াত ঘরানার মধ্যে ফেলানো যায়? যদি সেটা না হয়, তাহলে দেখবো তাকে আহলে হাদীস বানানো যায় কী না? সেটাও যদি না হয় তাহলে চেষ্টা করবো তাকে কোনভাবে শিয়াবাদের বিশ্বাসী বা মাজারপন্থীদের তালিকায় ফেলা যায় কী না। আর এটাও সম্ভব না হলে দেখবো, সে কি মাদানী, নাকি আজহারী, নাকি কাসেমী নাকি নদভী। এভাবে আগে কোন একটা ক্যাটাগরিতে ফেলবো, তারপর সব রাগ+ক্ষোভ তার উপর ঝাড়তে থাকবো।
এভাবে আমরা কাউকেউ সম্মানের জায়গায় থাকতে দেইনি। এই রোগটা আলেম সমাজে অনেক আগে থেকেই বিরাজমান। কিন্ত তখন সেটা বুঝা যেতো না ফেসবুকের এমন উম্মুক্ত ময়দান না থাকায়। বর্তমানে ফেসবুক ইউটিউব আমাদের সে চরিত্রটা খুব নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিযেছে। এই অঙ্গনে কোন একজন তরুন আলেমকে দেখবেন, সে তার পছন্দের আলেম বন্ধু বা সামান্য সিনিয়র ভাইকে আমার শাঈখ আমার শাঈখ বলে সম্মোধন করবে, কিন্তু তার শাঈখেরও শাঈখ, তার সরাসরি উস্তাদেরও উস্তাদ এমন বড় আলেম সম্পর্কে তার জ্ঞান না থাকায় তিনি যদি কোন মতামত দেন, আর সেটা যদি তার পছন্দ না হয়, তাহলে সাথে সাথেই স্যোসাল মিডিয়ায় ঝড় তুলে ফেলবে। শুধু একটা উদাহরণ দেই, আল্লামা উবায়দুর রহমান খান নদভী দা.বা. এর সাথে তাঁর খুবই কাছের ভক্ত দাবী কারীরাও এমন ভাষায় তাকে স্যোসাল মিডিয়ায় আক্রমন করে বসে, যে কেউ এসব দেখলে আর স্যোসাল মিডিয়ায় আর কথাই বলতে চাইবে না। এসব করে এদেশের উগ্রমেজাজের তরুণ ভক্তরা বড়দেরকে কঠিন চাপের মধ্যে রাখে। কখন কোন কথা বলার কারণে তাকে কার দালাল বলে আখ্যায়িত করে বসবে, তার ঠিক নেই। এসব কারণে অনেকাংশে বড়রা কথা বলাই ছেড়ে দিয়েছেন।
করোনা ভাইরাসের এই সময়ে দুটি ঘটনা আমাদেরকে সেই শিক্ষাটাই দিয়ে গেছে। এর প্রথমটি হলো- সরকারীভাবে সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণার পর মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ মাদ্রাসার সকল কার্যক্রম বন্ধ করবেন কী না সে বিষয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলেমদের বৈঠক হয়। কওমী মাদ্রাসায় একেবারেই বার্ষিক পরীক্ষা সন্নিকটে থাকায় তারা পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত জানান যে, সকল প্রকার ক্লাশ বন্ধ থাকবে। তবে পরীক্ষা যথাসময়ে হবে। তখনো করোনা ভাইরাস জনিত বাংলাদেশের পরিস্থিতি এতটা খারাপ হয়নি। এটা নিয়ে এমনসব বাজে মন্তব্য করতে থাকে তরুন আলেমরা যা দেখে আমার কাছে খুবই খারাপ লেগেছে। বড়দের সিদ্ধান্তটি ছিল যুৎসই কৌশলী। মাদ্রাসা বন্ধ, তবে পরীক্ষাটা হয়ে গেলে বছরটা শেষ হয়ে যায়। আর তাতে আজকে যারা বেতন নিয়ে এত কথা বলছেন, তখন সেটা কোন সমস্যা তৈরী করতো না।কোন রকম পরীক্ষাটা হয়ে গেলে তারপর বন্ধ হলে সবাই বেতন ভাতা পেয়ে যেতেন।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো- মসজিদে জামাত বন্ধ করা হবে কী না। সেটি নিয়ে। উলামায়ে কেরাম সিদ্ধান্ত দিলেন, মসজিদ একেবারে বন্ধ করা যাবে না। তবে খুবই সীমিত আকারে জামায়াত হবে। এ বিষয়টা মনে হয় কেউই বুঝতে পারলেন না। সীমিত করা মানে জামাত সংক্ষিপ্ত সময়ে করা, জামায়াত অল্প লোক নিয়ে করা, জনতার উপচে পড়া ঢেউ রুখে দেওয়া। খুতবা সংক্ষিপ্ত করা। আজানের সাথে সাথেই কোনরকম ভাবে জামাত শেষ করে মসজিদ লক করে দেওয়া, স্যোসাল ডিস্টেন্টস রক্ষার জন্য জামাতের মধ্যে মুসুল্লিদের খুব ফাঁক ফাঁক করে দাঁড়ানো ইত্যাদি। কিন্তু এ জিনিসটা কেউই বুঝবো না। উপরুন্ত বড় বড় আলেমদের যা-তা গালিগালাজ।
অতঃপর সরকার সুযোগমতো প্রজ্ঞাপন জারি করে দিলো, ৫জন আর ১০জন। এটা যে কতবড় দুর্ভাগ্যজনক বিষয় এখন হয়তো অনেকেই টের পাচ্ছেন। বিশাল বিশাল মসজিদে ৫জন মুসুল্লি নিয়ে নামায আদায় না করে ব্যক্তিগত দূরত্ব মেইনটেইন করে এখন যেমন অনেক মসজিদে সীমিত আকারে জামাত হচ্ছে সে রকম করা যেতো। আমাদের অতিরিক্ত প্রশ্নের কারণে সরকার সুযোগ পেয়েছে। এদেশের বড় আলেমদেরকে আমরাই অপমান করেছি। এখন বলছি, উলামায়ে কেরাম সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। হ্যাঁ, সত্যিই যদি উলামায়ে কেরাম আজকের এই ৫জন/১০জনের সিদ্ধান্ত তখন নিতো, তাহলে এইদেশের তরুন আলেমরা বড়দেরকে কাফের বানিয়ে ছেড়ে দিতেন। এখন সরকার বলছে। সব জি হুজুর জি হুজুর করছে।
আমরা আমাদের পায়ে কুড়াল মারছি। অতিরিক্ত কথা বলে বড়দেরকে বিতর্কিত করছি। তাদের কোন সিদ্ধান্তকেই সমর্থন করে সেটা কীভাবে সহজে বাস্তবায়ন করা যায় সেদিকে না গিয়ে বনি ইসরাইলের মতো, এটা কেন হলো, ওটা কেন হলো না? অমুককে কেন মিটিং এ রাখা হলো? অমুকে এসবের কী বুঝে? এসব নানা কথার ফুলঝুড়ি উড়িয়ে দিই।
স্থানীয় ইমাম ও আলেমরা যদি প্রশাসনের সহযোগিতায় নামাযকে তখনই সীমিত করে দিতেন তাহলে আজকের এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে হতো না। আজকে ৫জনের বেশি মুসুল্লি হলে এখন পুলিশ গ্রেফতারের খবর আসছে। খুব ভালো লাগছে আমার কাছে। এদেরকে গ্রেফতার করাই উচিত। এরা আলেমদের ভাষা বুঝে না। বুঝে রাষ্ট্রের ভাষা। অস্ত্রের ভাষা। আপন ভাইদেরকে শত্রু মনে করে সবসময়ই উৎ পেতে থাকে কীভাবে অমুকরে, তমুকরে ধোলাই দেওয়া যায় সেই চিন্তায়। আল্লাহ আমাদেরকে বড়দের আনুগত্য করে দ্বীনের পথে চলাা সহজ করে দিন। আমীন।