“গ্রাম্য সালিশের” কবল থেকে নিরীহ সাধারণ মানুষ কি কখনোই মুক্তি পাবে না?

0

এম আরমান খান জয় :
“একটি সুস্থ সমাজ চাই,
যেখানে মানুষে মানুষে বৈষম্য নাই”।

সালিশের আইনগত কোন ভিত্তি নেই। দীর্ঘদিনের রেওয়াজ বা প্রথা হিসেবে এটি চলে আসছে। তবে গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে বিভিন্ন বিরোধ নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। আমাদের দেশ একটি গ্রাম প্রধান দেশ, এখানে অধিকাংশ লোক গ্রামে বসবাস করে। তাদের সরল সাদামাটা জীবনযাপনে নানাবিধ সমস্যা দেখা যায়। সেই সমস্যা সমাধানে গ্রাম্য সালিশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। কিন্তু অতি দুঃখজনক হলেও সত্যি গ্রাম সালিশ ব্যবস্থা এখন অর্থহীন সহজ, সরল, সাধারণ মানুষকে শোষণের অন্যতম হাতিয়ার। আজকাল ৮০% সালিশ বিচার ন্যায়সঙ্গত হয় না। এর পেছনে অনেকগুলো কারণ কাজ করে। সাম্প্রতি গোপালগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার কাঠি ইউনিয়নের একটা ঘটনা না বল্লেই নয়, ঘটনা টি আমার পরিবারের ও আমার এলাকার এক প্রভাবশালী টাকা ওয়ালার সাথে। সালিশ বৈঠকে আমার পরিবার নির-অপরাধ থাকলেও কাকতালীয় ভাবে অপরাধীরা ই জয়ী হয়ে যায় । এখন আসি মূল কথায়, আমরা সাধারণত ঘুষ, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, লুটপাট, স্বজনপ্রীতির জন্য দায়ী করি-সরকারি কর্মচারি-কর্মকর্তা কেরানী থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন সচিব পর্যায়ের কর্তা মেম্বার, চেয়ারম্যান, রাজনৈতিক নেতা, পাতি নেতা, এমপি, মন্ত্রী ব্যক্তিদের। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের এক কালের মহৎ গুণাবলীর অধিকারী সেই ন্যায়ের প্রতীক সালিশ-বিচারক গ্রাম্য মাতব্বররা আজকাল বিড়ি, সিগারেট, লাল চা, দুধ চা, থেকে শুরু করে নগদ অর্থ সালিশ-বিচার ফিস হিসেবে গ্রহণ করে উল্টা-পাল্টা বিচার করছেন। ন্যায়কে অন্যায় আর অন্যায়কে ন্যায়ে পরিণত করাই তাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা সমাজে সৃষ্টি করছে অস্থিরতা। এখন এমন এক অবস্থা দাঁড়িয়েছে, গ্রামে যাদের কিছু টাকা আছে বিচারে তাদের পাল্লাটাই ভারি। কারণ, গ্রামের সরদার নামক কিছু লোক আছে, তাঁরা বেশিরভাগ সময়ই তাদের পক্ষ নিয়ে কথা বলে। শুধুমাত্র নিজেদের পকেট ভারি করার জন্য।

সমস্যা সমাধানের চেয়ে সমস্যাকে জিইয়ে রেখেই দুইপক্ষের কাছ থেকে স্বার্থ সিদ্ধি হাসিল করতে তারা ব্যস্ত। গ্রাম্য সালিশ বিচারে নীতি, নৈতিকতায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়ার কারণেই আজ আমাদের সমাজজীবনে হিংসা, বিদ্বেষ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে যা কখনো কখনো বংশ পরস্পর প্রভাবিত হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রতিবন্ধকতা গ্রাম্য সালিশ-বিচার ব্যবস্থাকে করেছে প্রশ্নের সম্মুখীন যেমন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ন্যায়ের পক্ষে লোক না থাকা, ধরি মাছ না ছুঁই পানি অবস্থান, একদিনের সালিশ বার বার বসা, বংশ প্রীতি বা এলাকা প্রীতি, স্বজনপ্রীতি, সালিশ বসার পূর্বে দুই পক্ষ থেকে টাকা জমা নেয়া, মিথ্যা সাক্ষী, চূড়ান্ত মিমাংসা না করা, কুচক্রী লোকের কু-পরামর্শ, আইন সম্পর্কে জ্ঞান না থাকা এবং দেশে যে সরকার থাকুক না কেন সেই সরকারের প্রতিনিধির ক্ষমতার দাপটে প্রতিপক্ষ ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া।
একটি সাধারণ বিষয় নিয়ে সংগঠিত সালিশ-বিচারে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং জামাতি ইসলামীর বিচারকদের উপস্থিতি আবির্ভাব লক্ষণীয়। যা সমস্যা সমাধানের চেয়ে সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। আজকের দুনিয়ায় বেশিরভাগ সালিশ বিচারক বা মুরব্বিদের মধ্যে দূরভিক্ষণ যন্ত্র দিয়ে সততা খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

গ্রাম্য সালিশী বিচার ব্যবস্থায় আপোশ নিস্পত্তিতে যে কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারলে উভয় পক্ষেরই কল্যাণ হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় আদালতে গিয়ে লাখ লাখ টাকা খরচ করেও কোনো সুরাহা হয়ই না বরং ঘাটে ঘাটে সেলামি দিতে দিতে দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্থ হয় অর্থনৈতিকভাবে। এখনো কিছু সৎ, খোদা ভীরু, এবং যোগ্য বিচারকদের কারণে গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে আপোশ মিমাংসার মাধ্যমে উভয় পক্ষই বিচার পেয়ে ঘরে ফিরেন।

আমাদের গ্রামীণ, সামাজিক, পারিবারিক, সমস্যা যতটা ভয়ানক তারচেয়ে বেশি ভয়ানক আমাদের মন মেজাজে, অহংকার, অস্তিত্বের লড়াইয়ে, লোভ-লালসা ইত্যাদিতে। তাই বলতে চাচ্ছি আগে আমাদের মনটাকে পরিস্কার করা দরকার, সমস্যার সমাধান হবেই। বিচার মানি কিন্তু তাল গাছ আমার এই যে ইগু স্বভাব তা থেকে উত্তরণ ঘটানো দরকার। যতক্ষণ না আপনার মনটা ঠিক হচ্ছে হাইকোর্টের রায় নিয়েও আপনার সমস্যার সমাধান হবেনা। আপনার সমস্যা সমাধানের লক্ষে নিজেই চিহ্নিত করুন সমস্যাটা কি। আপনি যে সমস্যায় পড়েছেন তার একটা পরিস্কার ধারণা সৃষ্টি করুন নিজের মধ্যে। আপনার সমস্যার সাথে সম্পর্কিত অন্যদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আপনাকে বুঝতে হবে আন্তরিকতার সহিত। সম্ভাব্য একটি পরিকল্পনা তৈরি করুন সমস্যা সমাধানের লক্ষে। সম্ভাব্য পরিকল্পনা গুলো বিচার বিশ্লেষণ করেন নিজ থেকে এবং এর থেকে কি ভাবে উত্তরণ সম্ভব স্টাডি করুন।

সমস্যা সমাধানে সব সময় পজেটিভ চিন্তা করুন, আত্ববিশ্বাসী হয়ে বলুন এটা কোনো সমস্যাই নয়। আমাদের নিত্যদিনের সামাজিক সমস্যাগুলো ঠান্ডা মাথায় নিজ বিচারগুণে নিজেদের মধ্যে সমঝোতা সর্বোত্তম পন্থা। নিজের সমস্যা অন্যকে দিয়ে সমাধানের মানে হচ্ছে নিজ উদ্যোগে আপনি আপনার সমস্যা দ্বিগুণ বড় করছেন।

আলোচনার পরিসমাপ্তি ঘটাতে হবে। অনেক কিছুই অগোছালো অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা-সমালোচনা করে ফেলেছি। সালিশ বিচারক মাতব্বরদের মত বুদ্ধি-শুদ্ধি করে ঘুরায়ে পেচায়ে আলোচনা করতে পারি নি বলে দুঃখিত। সমস্যা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করতে করতে মুখে ফেনা না তুলে সমস্যা থেকে কিভাবে উত্তরণ ঘটানো যায় তা নিয়ে নতুন চিন্তা, চেতনা, ভাবনা হতে পারে সমাজ উন্নয়নে আমাদের দিক নির্দেশনা। আশার কথা হল, দুর্নীতির এ মহাপ্লাবনে হাতে গোনা কিছু লোক এখনও সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, বজায় রেখে চলছেন নিতান্ত কষ্ট ত্যাগ স্বীকার করে। আগের মতো এখনো সৎ সালিশ-বিচারক সংখ্যক স্বল্প হলেও আছেন যারা হক কথা বলেই যাচ্ছেন। তবে ভেজালের ভিড়ে তারা নিতান্ত কোণঠাসা বলেই মনে হয়। এই “গ্রাম্য সালিশ” এর কবল থেকে গ্রামের নিরীহ, সহজ-সরল, সাধারণ মানুষ কি কখনোই মুক্তি পাবে না? সরকারের যথাযথ উদ্যেগ ও প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ এবং গ্রাম্য সালিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করলেই এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসা যাবে, তথাপি মানুষে মানুষে বৈষম্য ও দুর হবে বলে আমরা আশাবাদী।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.